২২ জুলাই ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৬ষ্ঠ বর্ষ ২৭শ সংখ্যা: বার্লিন, রবিবার ০২জুল – ০৮জুল ২০১৭ # Weekly Ajker Bangla – 6th year 27th issue: Berlin,Sunday 02Jul– 08Jul 2017

হাসিকর - মূল গল্প: হাইনরিখ ব্যোল, জার্মান থেকে অনুবাদ - তীরন্দাজ

অনুবাদ সাহিত্য

প্রতিবেদকঃ সামহোয়্যার ইন তারিখঃ 2014-07-06   সময়ঃ 12:28:18 পাঠক সংখ্যাঃ 743

কেউ যদি আমাকে আমার পেশা কি জানতে চায়, বেশ লজ্জায় পড়ে যাই। এ প্রশ্নের উত্তরে মুখে কোন কথা যোগাতে চায় না, যদিও আমি যৌক্তিক কথার মানুষ হিসেবেই পরিচিত। আমি সেসব লোকদের হিংসা করি, যারা সরাসরি বলতে পারে, সে এক রাজমিস্ত্রী, নাপিত বা হিসাবরক্ষক। লেখকদের প্রতি আমার হিংসা, তাদের নামের সহজসাধ্যতার কারণে। এই প্রতিটি পেশার ক্ষেত্রেই পরিচয় ও বড় কেন বিবরণ দিতে হয়না। কিন্তু এ ধরণের প্রশ্নের উত্তরে আমি বাধ্য হই বলতে, 'আমি একজন হাসিকর'। পরপরই দ্বিতীয় প্রশ্ন, 'এটা কি আপনার জীবিকা'? যখন দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে সত্যি বলার জন্যে 'হ্যা' উত্তর দিতে হয়, তখন আরো কিছু প্রশ্নের অবতারণা ঘটে । আমার হাসি দিয়েই বেশ ভালভাবেই জীবন চালাই এবং অর্থনৈতিক বিচারে বলা যেতে পারে, এ হাসির বাজারও বেশ ভাল। আমি একজন ভাল ও দক্ষ হাসিকর, আমার মতো ভাল আর কেউই হাসতে পারে না, কেউই হাসির খুটিনাটি সুক্ষতা আমার চেয়ে ভাল জানেনা। অযাচিত প্রশ্ন থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্যে, বহুদিন ধরে নিজেকে অভিনেতা বলে পরিচয় দিতাম। কিন্তু আমার চেহারায় ও বাচনভঙ্গীতে অভিনয়ের পরিস্ফুটন এতোই কম যে, এ পরিচয় নিজের কাছেই সত্যি বলে মনে হতো না। আমি সত্যবাদী ও সত্যটি এই যে, আমি একজন হাসিকর, ক্লাউন নই, কৌতুকঅভিনেতাও নই। আমি লোকজনকে আনন্দ দিতে পারিনা, তবে আনন্দের পটভুমিকা তৈরী করতে পারি। আমি এক রোমান সম্রাটের মতো হাসতে পারি, প্রয়োজনে হাসতে পরি এক স্পর্শকাতর ছাত্রের মতো। উনিশশো শতাব্দীর হাসিতে আমি যেমন পটু, তেমনি পটু সতেরশো শতাব্দীর হাসিতেও। যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে আমি প্রতিটি শতাব্দীর, প্রতিটি সামাজিক শ্রেনীর, প্রতিটি বয়েসের হাসি হাসতে পারি। জুতোর শুখতলা লাগানো যেমন ভাবে শিখতে হয়, হাসিও আমি তেমনি শিখেছি। আমেরিকার হাসি তার বুকের মাঝে আছে, আফ্রিকার হাসির বিভিন্ন রং, সাদা, লাল, হলুদ। আমাকে পয়সা দিলে পরিচালক যেমন চাইবেন, তেমনিই হাসব।

আমি প্রায় অপরিহার্য হয়ে পড়েছি, গ্রামোফোন রেকর্ডে হাসি, টেপেও হাসি। রেডিওতে নাটকের পরিচালকদের আমার দিকে নজর খুব। আমি বিষাদের হাসি হাসি, প্রশ্রয়ের হাসি হাসি। কখনো হাসি ট্রামচালকের মতো, কখনো খাবারের দোকানের শিক্ষানবীসের মতো। কখনো সকালের হাসি, কখনো বিকেলের হাসি, কখনো বা রাতের, কখনোবা গোধুলিলগ্নের। মোদ্দা কথা হচ্ছে, যখন যেভাবে হাসা দরকার, তা আমি অবলীলায় হেসে দিই প্রতিবারই।

আমার এই পেশা যে যথেষ্ট পরিশ্রমের, আশা করি তা বিশ্বাস্য। তাছাড়া আমার বিশেষ ক্ষমতায়, যাকে 'ছোয়াঁচে হাসি' বলে আখ্যা দেয়া যেতে পারে, ভীষন দক্ষ আমি। বিশেষ করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেনীর কৌতুকঅভিনেতারা যখন অভিনয়ের সময় স্বাভাবিকভাবেই চুড়ান্ত সাফল্যে পৌছানোর জন্যে ভয়ে কাঁপতে থাকেন, তখনই আমাকে ছাড়া চলে না তাদের। আমি প্রায় প্রতি সন্ধ্যাতেই ভেরাইটি শো গুলোতে এক কোনে চুপচাপ বসে থাকি, ও দুর্বল মূহুর্তগুলোতে আমার তথাকথিত ্তুছোঁয়াচে হাসি্থ হেসে দিই। খুব মেপেঝুকে করতে হয় তা, একটু আগে বা পরে হলে একেবারেই চলবে না। একেবারে সঠিক সময়ে পরিকল্পনামাফিক হাসিতে ভেঙ্গে পড়ি আমি। সমস্ত দর্শকরাও হাসির সোরগোল তোলে ও তাতেই পার পেয়ে যায় অভিনেতার চুড়ান্ত মূহুর্ত।

তারর সন্তর্পনে পোষাক পাল্টানোর ঘরে গিয়ে ওভারকোটটি পড়ি, অবশেষে কাজের ছুটি ভেবে আনন্দিত মনে বেরিয়ে পড়ি। বেশীভাগ ক্ষেত্রেই বাড়ীতে পৌঁছেই টেলিগ্রাম পাই, ্তুহাসার জন্যে আপনাকে জরুরী প্রয়োজন। মঙ্গলবার রেকর্ড করা হবে্থ। কয়েক ঘন্টা পরেই আমাকে নিজের ক্ষমতাকে অভিশাপ দিতে দিতে ট্রেনে চড়তে হয়।

সবাই বুঝতে পারবেন নিশ্চয়ই যে, আমি ছুটির দিনে না কোথাও বেড়াতে গেলে হাসতে খুব একটা আগ্রহী হই না। যে দুধ দোয়ায়, সে গরুকে ভুলতে পারলে খুশী হয় আর রাজমিস্ত্রী খুশী হয়, যদি সে ইট-সুড়কী ভুলতে পারে। কাঠমিস্ত্রীর বাড়ীর দরজাই সবচেয়ে ত্রুটিপূর্ণ, তার সব ড্রয়ারই টেনটুনে খুলতে হয়। ময়রা ভালবাসে টক শশার আচার, কশাই ভালোবাসে মিষ্টির গোল্লা। রুটিওয়ালার রুটির চেয়ে মাংসের বেশী ঝোঁক। পেশাদার হিসেবে ষাড়ের সাথে যারা যুদ্ধ করে, অবসরে তারা পোষে কবুতর। মুষ্টিযোদ্ধারা শিশুদের নাকে রক্ত দেখলে ভয়ে সাদা হয়ে যায়। আমি নিজেও এসব ভাল টের পাই, কারণ কাজের শেষে হাসি না কখনোই। আমি একজন গম্ভীর ধরণের মানুষ ও লোকে আমাকে সেজন্যে হতাশাবাদী আখ্যা দেয়।

আমাদের বিবাহিত জীবনের প্রথমদিকে আমার স্ত্রী আমাকে প্রায়ই বলতো, 'হাসো না একবার'! কিন্তু এতদিনে সে বুঝে নিয়েছে যে, তার এই অভিলাস পূরণের সাধ্য আমার নেই। আমি তাতেই খুশী হই, যদি আমার পরিশ্রান্ত চেহারার ছাপ, উত্তেজিত মেজাজ খুব সতর্কতার সাথে ঠান্ডা করতে পারি। অন্যদের হাসিও বিরক্ত করে আমাকে, কারন তা আমাকে আমার পেশার কথা মনে করিয়ে দেয়। এভাবেই আমরা একটা শান্তিপূর্ন, শান্ত জীবন যাপন করি, কারণ আমার স্ত্রীও হাসতে ভুলে গিয়েছে। মাঝে মাঝে ওকটু মুচকি হেসে আমার হাতে ধরা পড়ে সে, তখন আমিও মুচকি হাসি। আমরা খুব কম আওয়াজে কথা বলি, কারন 'ভেরাইটি শো' ও 'রেকর্ডিং রুম' এর শোরগোলকে ঘৃণা করি আমি।

যে মানুষ আমাকে ভাল চেনেনা, তারা আমাকে একজন তালাবন্ধ মুখের মানুষ হিসেবে ভাবে। হয়তো আমি সেরকমই, কারণ পেশার হাসির জন্যে বেশ ঘনঘনই মুখ খুলতে হয় আমার।

ভাবলেশহীন চেহারা নিয়ে জীবনের পথে চলছি আমি। মাঝে মাঝে, কদাচিৎ মৃদু হাসিকে প্রশ্রয় দিই। মাঝে মাঝে ভাবি, আমার পুরো জীবনে একবারও হেসেছি কি না। আমার মনে হয় না। আমার সহোদররা নিশ্চয়ই বলবে যে ছোটবেলা থেকেই এক গম্ভীর বালক ছিলাম আমি।

বিভিন্ন ধরণের হাসি আমি হাসি, অথচ আমার নিজের হাসি কেমন, সেটাই জানা হলোনা আমার।

(সামহোয়্যার ইন - পুরোপুরি আক্ষরিক অনুবাদ তো অসম্ভব। আমি যতোটা সম্ভব মূল লেখকের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করি। তারপর যতোটা সম্ভব বাংলা ভাষার সাবলীলতার জন্যে যুদ্ধ করে যাই। তবে আমার চোখ থাকে সবসময়েই মূল লেখকের দিকে নিবদ্ধ)



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

বাংলাদেশের প্রাইমারি ও মাধ্যমিক শিক্ষা পাঠক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছে জানুয়ারি ২০১৭ তে বিতরণকরা নতুন বইয়ে অদ্ভুত সব কারণ দেখিয়ে মুক্ত-চর্চার লেখকদের লেখা ১৭ টি প্রবন্ধ বাংলা বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামী মৌলবাদী লেখা যোগ হয়েছে, আপনি কি এই পুস্তক আপনার ছেলে-মেয়েদের জন্য অনুমোদন করেন?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ