২৮ এপ্রিল ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৫ম বর্ষ ২৮শ সংখ্যা: বার্লিন, শনিবার ০৯ জুল - ১৫ জুল ২০১৬ # Weekly Ajker Bangla – 5th year 28th issue: Berlin, Saturday 09 July – 15 july 2016

হাইনরিখ ব্যোল এর সাক্ষাৎকার : দি আর্ট অব ফিকশন

জার্মান নোবেল বিজয়ী কথাসাহিত্যিক হাইনরিখ ব্যোল

প্রতিবেদকঃ গল্পপাঠ তারিখঃ 2016-07-13   সময়ঃ 00:00:08 পাঠক সংখ্যাঃ 192

[গল্পপাঠ - ব্লগ ভিত্তিক একটি অসাধারণ সাহিত্যপাতা - যারা গল্প লেখেন, গল্প পড়েন, গল্প নিয়ে ভাবেন, গল্প লিখতে চান তাদের জন্য এই সাইট। এখানেই জার্মান নোবেল বিজয়ী কথাসাহিত্যিক হাইনরিখ ব্যোল এর সাক্ষাৎকারটি (বাংলা অনুবাদ) প্রকাশিত হয়, হাইনরিখ ব্যোল এর ৩০ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ১৬ জুলাই লেখাটি অনুমতিক্রমে পুনঃ প্রকাশিত হলো]> গল্পপাঠ   (ছবি: হাইনরিখ ব্যোল স্টিফটুং)

জীবন-যাপনের মধ্যে একটা আধ্যাত্মিক তাৎপর্য খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় লিখেছেন হাইনরিখ ব্যোল। তাঁর জন্ম জার্মানির কোলনে, ১৯১৭ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হয় তাঁকে। রাশিয়া আর ফ্রান্সের রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেন, আহত হন, মার্কিন যুদ্ধবন্দী শিবিরে তাঁকে কয়েদি জীবন যাপন করতে হয়। পরে, তাঁর মহৎ সাহিত্যকর্মে তাঁর দুঃসহ যুদ্ধজীবনের কথা স্থান পাবে। রচিত হবে- দ্য ম্যাড ডগ, দ্য ক্লাউন, গ্রুপ পোট্রেট উইথ লেডি, দ্য লস্ট অনার অব ক্যাথরিনা ব্লুম, দ্য ট্রেন ওয়াজ লেট, বিলিয়ার্ডস অ্যাট হাফপাস্ট নাইন। নোবেল পেয়েছেন ১৯৭২ সালে। ১৯৮৫ সালে ১৬ জুলাই পৃথিবী হারায় এই মানুষটিকে, যার জীবন ভরে ছিল মহাযুদ্ধের হতাশায়। দ্য প্যারিস রিভিউয়ের সাক্ষাৎকারটিতে হাইনরিখ বোল তাঁর টেকনিক নিয়ে কথা বলেছেন, আর এই কারণে আমাদের কাছে সাক্ষাৎকারটি সারবান। অনুবাদ- এমদাদ রহমান।

সাক্ষাৎকারী: 'অ্যাডাম, কোথায় ছিলে তুমি'-তে আপনার কাজ পাঠককে চমকে দেবার ক্ষমতা দেখে আমি বিস্মিত, যেখানে তার শেষ পৃষ্ঠায় মুখ্য চরিত্রটি মারা যায় কিংবা 'গ্রুপ পোট্রেট উইথ লেডি'-তে বর্ণনাকারীর সঙ্গে লেনি পিফেইফার সাক্ষাতের অপেক্ষায় থাকায় পাঠক উৎকন্ঠিত হয়, এটা আপনি শুধুমাত্র কয়েকটা শব্দে তুলে ধরেছেন। হঠাৎ চমকে দেবার এই খেলাটা কোন উদ্দেশ্য থেকে করে থাকেন? আপনি কি আপনার উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই বিস্মিত করাকে কৌশল করে নেন?

ব্যোল: না, আমি কখনোই তা মনে করি না। 'গ্রুপ পোট্রেট উইথ লেডি'-তে, এরকম হয়ে যাবার কারণ খুব যথাসম্ভব- আমি এই যথাসম্ভব কথাটির উপর জোর দিচ্ছি- বর্ণনাকারী বেশ দূরে দূরে থেকেছেন পুরো বইয়ে। তিনি একজন গবেষকে পরিণত হয়েছেন আর গবেষণার কাজে সহায়ক অনুভুতিগত প্রতিক্রিয়া, ঘটনার পেছনের ঘটনা, বাস্তবতা, মনের গতি-প্রকৃতি আর ঘটনাগুচ্ছকে সংগ্রহ করছেন। তিনি সম্ভবত প্রতিপক্ষের মুখোমুখিও হচ্ছেন না, দূরে থাকছেন। 'অ্যাডাম, কোথায় ছিলে তুমি'-তে যথাসম্ভব বলতে হবে, একটি বিশেষ পরীক্ষামূলক অংশ আছে, যা উপন্যাসে অন্যতম। আমেরিকানদের হাতে বন্দি হওয়ার আগে, জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলে যুদ্ধের শেষ মাসটি আমি কাটিয়েছি। সেখানে প্রত্যক্ষ করেছিলাম যে জার্মান সৈন্যরা সেখানকার বাড়িগুলোতে ওড়ানো সাদা পাতাকা নামিয়ে ফেলবার জন্য গুলি ছুঁড়ত। আমেরিকার সৈন্যরা যতই অগ্রসর হচ্ছিল, রণাঙ্গনের মাঝখানের গ্রাম ও ছোট শহরগুলি তাদের আগমনের জন্য অপেক্ষা করত আর টাঙিয়ে দিত সাদা পাতাকাগুলি, সাদা পতাকা উত্তোলন ছিল নিষিদ্ধ, মৃত্যুদণ্ড দিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। খুব স্বাভাবিকভাবেই, রণাঙ্গন বদলে যাবার কারণে কিছু গ্রামে দখলদারিত্বেরও পরিবর্তন হয়। জার্মান আর্মি কিংবা তাদের নির্দিষ্ট ইউনিট সাদা পতাকা উড়ানো বাড়িগুলোকে পুড়িয়ে দিয়েছিল। ‍এইসব কারণে, সাদা পতাকা আমার কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটা প্রতীক। সম্ভবত- আমি জানতামই না সেই সময়ে আমার মনে আসলে কী ছিল, আমার একটাই ভাবনা ছিল- শেষ মুহূর্তে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমার জীবনের সমাপ্তি ঘটবে যা আমাকে গল্পের শেষ দিকে নিয়ে যাবে- এই উপায়ে। অজস্র লোকের ভাগ্যে কিন্তু এই ঘটনাই ঘটেছিল। রাইনল্যান্ড-এ রণাঙ্গন থেকে পালানো বিপুল সংখ্যক মানুষকে মৃত্যুর ঢেউ এসে তলিয়ে দিয়েছিল, এমনকি সেখানকার মৃত্যুদণ্ড সম্বন্ধে এখনো সব জানা যায়নি। গাছে ঝুলিয়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতো, দেখামাত্রই গুলি করে হত্যা করা হতো পালিয়ে বেড়ানোদের। সেখানে একটি স্বেচ্ছাচারী বিচারব্যবস্থা ছিল। আমার বিশ্বাস হয়েছিল যে, যে-কেউই যেকোন পলাতক সৈন্যকে নির্বিচারে গুলি করে মেরে ফেলবার পক্ষে হিটলারের অনুমোদন ছিল। এদিকে, যুদ্ধের শেষ মাসে, আমার ভাইকে সঙ্গে নিয় স্বয়ং আমি, রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে যাওয়া সৈন্য হিসেবে এক নিরন্তর ভয়ের মধ্যে দিন কাটাতে লাগলাম : 'আমরা কি পালিয়ে গিয়ে বাঁচতে পারব? আমরা কি এখান থেকে জীবিত বের হতে পারব, বিরুদ্ধস্রোতে বেঁচে থাকবার চেষ্টাটা করতে কি পারব? তারপরে, সমূহ বিপন্নতা থেকে জেভাবেই হোক বের হবার প্রাণান্ত চেষ্টায়- মনে হল যে এটাই সবচে নিরাপদ পন্থা- আবার আমি আর্মিতে ফিরে যাই। পনেরো-ষোলো দিনের মধ্যেই আমি সেনাবাহিনীর দ্বারা না মরে আমেরিকানদের হাতে বন্দী হই। আমি প্রায়ই দেখেছি সাদা পতাকার সঙ্গে কী ঘটছিল। আর, অবশ্যই আমার জন্য- সেই বিশেষ রঙের থেকে পালিয়ে যাওয়া আমি, যে কি না তার নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কায় আছে, ভীত- সাদা ব্যাপারটা সে সময় আমার মনে গভীর রেখাপাত করে। এটা কোনওভাবেই ইচ্ছাপূরণের মতো পরিসমাপ্তি নয়।

সাক্ষাৎকারী: আমি সেই সৈন্যটির সঙ্গে তার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম যেখানে একটা সাদা পতাকা পতপত করে উড়ছিল, এবং ঠিক যখনই পৃষ্ঠাটা উলটালাম দেখলাম সেখানে এক অতর্কিত, হতবিহ্বল-করা মুহূর্ত। আমি যেন নিজেকে প্রায় ভেঙে ফেললাম।

ব্যোল: আমার এক তরুণের কথা মনে আছে, সে ছিল ননকমিশনড অফিসার, যে রণাঙ্গন ছেড়ে মায়ের সঙ্গে কফি খেতে গিয়েছিল। মাত্র চার কিলোমিটার কিংবা আরও একটু বেশি হয়তো দূরত্ব ছিল তার মা'র ঘরের। সে পালিয়ে গেছে ধরে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
সাক্ষাৎকারী: সে কি একা ছিল না?

ব্যোল: সেটা পরিষ্কার নয়। সে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শীও ছিল না কিংবা অত্যুৎসাহী সৈনিকও ছিল না, কিন্তু সে তার মা'র সঙ্গে দেখা করতে মাত্র চার কিংবা পাঁচ কিলোমিটার পথ গিয়েছিল, তারপর তারা তাকে হত্যা করে। এমন ঘটনা কিন্তু অজস্র অজস্র ঘটেছে। ১৯৪৫-এর মার্চে কোলন সফরে গিয়ে, ভারী বোমাবর্ষণের পর, শত শত পলাতক সৈন্যের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়, যারা ভাঙা ইট দিয়ে একটা ঘুপচিতে বাস করছিল, আবার, অনেকে রোমান আমলের পরিত্যাক্ত ভূগর্ভের কুঠরিতেও লুকিয়ে ছিল। ফ্রান্সের রণাঙ্গন থেকে তারা পালিয়ে এসে এখানে নিজেদেরকে লুকিয়ে ফেলেছিল। কালোবাজারে বিড়ি বিক্রি করে, জিনিসের বদলে জিনিস অদল-বদল ইত্যাদি নানা রকম ফন্দিফিকির করে তারা বেচে ছিল। যারা যুদ্ধ থেকে পালিয়ে এখানে এসেছিল লোকজন তাদের পছন্দ করত, তা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে তাদের হত্যা করা হতো- এ বিষয়টা আসলে সবিশেষ তাৎপর্য্পূর্ণ ছিল। সাদা পতাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ মোটিফ। এখনো মনে আছে, বাবা বেশ আগে থেকেই একটা সাদা পতাকা সঙ্গে রাখতেন। আমেরিকানরা এখানে আসার অনেক আগে থেকেই বাবার সঙ্গে সব সময়ই একটা রুমাল আর একটা পতাকা উড়াবার খুঁটি প্রস্তুত থাকত, তিনি সেগুলি বের করতে চাইতেন, সঙ্গে সঙ্গে আমরা চিৎকার করতাম- 'এখন দেখো, পরিস্থিতি খুবই খারাপের দিকে যাচ্ছে, এত জলদি এটা দেখানো ভাল হবে না, সেই সময় এখনো আসেনি।' আপনি তাহলে বুঝতেই পারছেন- সাদা পতাকা আমার কাছে কতটা বিশেষ অর্থ বহন করছে।

সাক্ষাৎকারী: দীর্ঘদিন ধরেই দেখছি- আপনার লেখার একটা বিশেষ ঝোঁক কিংবা জোর দেওয়ার বিষয় হল আগমন আর প্রস্থান... কেন্দ্রবিন্দু হয় ট্রেন স্টেশন।

ব্যোল: ওহ, হ্যাঁ। তবে আমি মনে করি, এই ঝোঁকটা কিছুটা হলেও যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত, কারণ, যুদ্ধের এই সময়েই তো থাকে শয়ে শয়ে প্রস্থান, আর, চিরবিদায়। এই সময়ে নিরুদ্দেশ যাত্রা মানেই তো চূড়ান্ত প্রস্থান। কেউ জানে না- 'আমরা কি আবার একজন আরেকজনকে দেখতে পাব?' যুদ্ধের এইসব দিনরাত্রির বিদায়ের দর্শন সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা আছে, এমন কী আজকের দিনেও যখন আমি কোন জায়গা থেকে বিদায় নিই কিংবা স্থানীয় কোনও স্থান থেকে অন্যস্থানে চলে যাই, দুর্ভাগ্যক্রমে প্রায়ই আমি এরকম করে থাকি। বিদায়কে সব সময়ই বিবেচনা করা হয়েছে একটা পরিসমাপ্তি হিসেবে। এমনকি আমাদের একটি বাড়ি থেকে বের হয়ে অন্য বাড়িটিতে- আমরা যে বাড়িতে প্রায় সময়ই থাকি, সে-বাড়িটি ছেড়ে, অন্য বাড়িতে আসতে হলে- জিনিসপত্র সব বেঁধে ফেলতে হয়। ট্যাক্সিতে চড়তে হয় মালপত্রের বোঝা নিয়ে। প্রস্থান হল চিরকালের সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার; বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি কোনও একটি রূপকের মাধ্যম হতে অস্বীকার করে না- এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা হল : এখানে এই পৃথিবীতে আমরাই আমাদেরকে খুঁজে একটি অপেক্ষাগৃহে।
সাক্ষাৎকারী: আপনি বলেছেন- এই পৃথিবীই আমাদের পুনর্মিলনের স্থান। 

ব্যোল: হ্যাঁ, তা আপনি বলতে পারেন। কিন্তু আমি তো চরম প্রস্থানের আগ পর্যন্ত এখানেই এই মিলনস্থলে অবস্থান করব। সময় থাকতে থাকতে কিছু একটা করে ফেলতে হয়।
 

সাক্ষাৎকারী: দ্য ক্লাউন-এর হান্স শিনার-এর কথা মনে পড়েছে- ঠিক কীভাবে সে সিঁড়ির ধাপে বসে ছিল। 

ব্যোল: যুদ্ধের কিম্ভূতকিমাকার পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে যেতে আমরা দেখি যে চারপাশে যেন একটা স্থির আর অপরিবর্তনীয় অবস্থা বিরাজমান রয়েছে, আবার একটা স্থায়ী পরিবর্তনও ঘটতে থাকে প্রায় নিয়মিতই- এইরকম অদ্ভুত অবস্থা বিরাজ করে যুদ্ধকালে। আপনাকে যদি কোনও একটা ট্রেনে তুলে দেয়া হয়, এবং কোথায় পাঠিয়ে দেয়া হয়, তখন আপনি কোথাও না কোথাও পৌঁছে যাবেন, কিছুদিন সেখানে থাকবেন, তারপর আপনাকে আবারও ট্রেনে তুলে দেয়া হবে, পাঠিয়ে দেয়া হবে অন্য কোথাও- এই ধরনের কিম্ভূতকিমাকার অবস্থা নিয়ে আসে যুদ্ধগুলি। আপনি যদি সাধারণ জনতা আর সৈনিকদের কাছে এই পরিস্থিতিটা সঠিকভাবে তুলে ধরেন, তাহলে দেখবেন যে সকলেই পালিয়ে যেতে চাইবে।

সাক্ষাৎকারী: শুধু কি যুদ্ধের সময়ই এমন ঘটে? 

ব্যোল: সেখানে এই পরিস্থিতিটা অবশ্য যুদ্ধের আগে থেকেই ছিল। ক্ষমতায় যারা ছিল অর্থাৎ নাৎসিরাই ভয়ভীতি প্রদর্শন করত, ভয়ের কারণ ছিল তো তারাই, লোকজনকে দেশত্যাগে তারাই বাধ্য করেছিল। আপনি যেকোনো সময় তাদের হাতে আটক হতে পারতেন, তারপর যেকোনো অজানা জায়গায় আপনাকে পাঠিয়ে দেয়া হতো। সেই সময়ের সংকটময় অর্থনীতিও আমাদেরকে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য করেছিল। বাড়ি ভাড়া পরিশোধের সংকট তো ছিলই, গভীর সংকট। শুধু এই ব্যাপারটা ভেবে দেখেন- একটি ছেলে, বয়েস দশ কি বারো, অর্থনীতি বিষয়ে যার কোনও ধারণাই নেই কিন্তু সে এই বিষয়টা বুঝে গিয়েছিল যে- 'হে ঈশ্বর, আমি আশা করি আমরা বাড়িভাড়া দিতে পারব কিংবা আমাদেরকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। সবকিছুই একটির সঙ্গে অন্যটি সম্পর্কিত। আমার পিতা কয়েকটি বাড়ির মালিক ছিলেন, তার একটিতে আমরা থাকতাম, তিনি সেই বাড়িটিও বেচে দিলেন, আর্থিক মন্দার কারণে। এদিকে, মহামন্দা শুরু হল ঠিক তার পরের বছর যখন একটি ব্যাংক পরিস্থিতির কারণে ব্যর্থ হল। আমরা নিজেদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হলাম। বাড়িটা নিলামে বিক্রি হয়ে গেল আর সেই সঙ্গে ভয়েরও শুরু হল- 'মাথা গুঁজবার জায়গা কি আছে তোমাদের? বিছানা-বালিশ আছে?' পরে, আমার ছেলেদের জন্য, আমার সার্বক্ষণিক ভাবনা হয়ে দাঁড়াল তাদের জন্য একটা বাড়ি, একটা খাট, আর একটা কম্বলের ব্যবস্থা করা। পরিস্থিতিটা সব মিলিয়ে এমন বাজে হয়ে গিয়েছিল। রেলওয়ে স্টেশন তো আর বাড়ি নয়, আপনি তো জানেন, স্টেশন কিংবা ওয়েটিং রুমও বাড়ি নয়, আর- সবকিছুই হয়ে গিয়েছিল আর্মি ব্যারাক।

সাক্ষাৎকারী: কখনও আপনাকে হেমিংওয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। আপনি কি ভেবে দেখেছেন যে এই তুলনাটা সঠিক কিনা? 

ব্যোল: আমি অবশ্যই পুরোপুরি একমত নই। আমি প্রভাবিত হয়েছিলাম তার আঙ্গিকের দ্বারা। আঙ্গিকটা খুবই স্পষ্ট। তাঁর লেখার স্টাইলটা আমাদের জন্য ছিল বিপুল-বিস্ময়ে অভিভূত হওয়ার মত, এবং, আমরা প্রবলভাবে আকর্ষিত হয়েছিলাম কারণ খুবই স্পষ্টভাবে বলতে চাইছি- আমি খুব স্পষ্টভাবে বলছি- তিনি ছিলেন চরমভাবে অগভীর... আমাদের প্রখ্যাত জার্মান নিগূঢ়তার বিপ্রতীপে উপরিগত। কিন্তু এর পেছনে যা স্পষ্ট তা হল, সাংবাদিকতার ভাষায় বলতে চাইছি- অগভীরতাই কাউকে করে তোলে গভীরতার অধীশ্বর। আমি যেখানে তাঁর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করি- তার পৌরুষের ট্রমা'র মাঝে থেকেই- এটা সম্ভবত একটা ট্রমা, অবশ্যই তাঁর ক্ষেত্রে, কিংবা সেই নায়কোচিত ভক্তি! আমি কখনোই তা পছন্দ করিনি। ব্যাপারটা আমার মাঝে কোনও বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেনি আর এটা আমার কাছে খুবই অপছন্দের। তা সত্ত্বেও, তাঁর প্রকাশ-ভঙ্গিটি কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
 

সাক্ষাৎকারী: জার্মানীর জে. ডি. সালিঙ্গারের লেখা 'দ্য ক্যাচার ইন দি রাই'-এর সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্যে আপনি আর আপনার স্ত্রীর বেশ ভালোই ভূমিকা আছে।
ব্যোল: হ্যাঁ, আসলে হয়েছে কী, এই বইটির অনুবাদ করা হয়েছিল, খুবই ভাল অনুবাদ হয়েছিল বইটার, কিন্তু তবু পাঠক পাচ্ছিল না। এমন কি পাঠকের নজরে পড়বার জন্যও তেমন কিছু করা হচ্ছিল না। একজন সুইস প্রকাশককে দিয়েই তা যথাযথভাবে করানো হয়েছিল। আমরা মূল ইংরেজির সঙ্গে অনুবাদটির তুলনা করলাম, বই হয়ে সেটা বের হল, কঠোর সেন্সরশিপের কারণে এর কিছু অংশ অনুবাদে বাদ পড়ে গেল। সুইসরা বইটির উল্লেখযোগ্য অংশকে সেন্সর করেছিল, বিশেষ করে যৌনতা এবং সামরিক আগ্রাসনের বিরোধিতার ব্যাপারগুলি। কী আর করা, আমাদেরকে তখন অন্য প্রকাশ খুঁজতে হল, আমাদের নিজেদের প্রকাশক, তাকে রাজি করানো গেল, যদিও রাজি করানোটা ছিল খুব কষ্টকর, তিনি মোটেই বইটা ছাপাতে চাচ্ছিলেন না- আমরা পুনরায় 'দ্য ক্যাচার ইন দি রাই' বইটি পড়লাম, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে, যা যা সংশোধন করার, তা করা হল; আর, যে অংশগুলি আগে বাদ দেওয়া হয়েছিল তা সংযুক্তও করা হল। আমরা সালিঙ্গারের অন্যান্য লেখাগুলিও অনুবাদ করলাম- ফ্রানি এন্ড জুইয়ে, রেইজ হাই দ্য রুফবিম, ক্যার্পেন্টারস।
সাক্ষাৎকারী: সালিঙ্গারের সঙ্গে কি ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করেছিলেন?

ব্যোল: না। সাক্ষাৎ করাটা খুবই কষ্টকর কঠিন ব্যাপার ছিল।

সাক্ষাৎকারী: আপনি কি নিজেকে সমাজ থেকে দূরে একটি দেয়ালের পেছনে লুকিয়ে রেখেছিলেন, ঠিক যেমনটা তিনি করেছিলেন? 

ব্যোল: না। তবে আমি মনে করি যা-ই হয়েছে, তা হয়েছে জার্মানির ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। আমি কল্পনা করতে পারি, যদি নাৎসিরা যুদ্ধকালীন এবং যুদ্ধোত্তর সময়ের রাজনৈতিক উন্নয়নে যদি কোনও ভূমিকাই না রাখত, তাহলে আমাকে অবশ্যই একটি গোপন জীবন-যাপন করতে হত, একেবারে গোপন একটা জায়গায়, কিন্তু একটি ফেডারেল রিপাব্লিকের নাগরিক হিসেবে আমি কোনোভাবেই তা ঠিকমত করতে পারতাম না। মাঝে মাঝে আমি অবশ্য তা করতে চেষ্টা করেছি, আইরিশ এবং অবলোমভ-এর সমন্বয়ে কিছু একটা হতে চেয়েছি, যাকে বলা যাবে- আইরিশ-অবলোমভ, কিন্তু চেষ্টা করেও আমি তা হতে পারিনি। আমি অবশ্যই, সালিঙ্গারের নিঃসঙ্গতার, তার নিঃসঙ্গ জীবন-যাপনের ব্যাপারটা সম্পর্কে জানি। আমি এই জীবনকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি।
সাক্ষাৎকারী: এক সময় তো রাশিয়া থেকে আপনার প্রচুর বই প্রকাশিত হয়েছিল, এমনকি সেটা ছিল আমেরিকা থেকেও পরিমাণে বেশি। তো, রুশ অনুবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

ব্যোল: একটি বই বের হয়েছে এখানে, যার রচয়িতা হলেন হেনরি গ্লাদ, তিনি একজন আমেরিকান-স্লোভিক স্কলার, তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে আমার বইয়ের গ্রহণ-বর্জন সম্পর্কে বিস্তর লেখালেখি করেছেন। তিনি একজন রুশ-জার্মান পণ্ডিতের সঙ্গে মিলে রুশ অনুবাদগুলি দেখেছেন, যিনি আবার অনুবাদকও। ফলাফল ভীতিকর অনুবাদ। ঠিক যে প্রক্রিয়ায় রাশিয়ায় আমি পরিচিত হচ্ছিলাম ভুল অনুবাদে, সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে শুরু করলাম। বইয়ের অনুবাদকর্মগুলি হয়েছে খুবই নিকৃষ্ট মানের, আর এতে করে অবশ্যই রাশিরার পাঠকরা বিভ্রান্ত হয়েছেন। কিছু কিছু বিষয় তারা বুঝতেই পারেননি, তারা ভেবেছেন- হে ঈশ্বর, লোকটার ভিতর কী ঢুকেছিল! দুঃখজনক এই ব্যাপারটা।

সাক্ষাৎকারী: আপনি কি রাশিয়াতে আগের মত এখনও পঠিত হচ্ছেন? 

ব্যোল: দেখেন, ১৯৭২-এর পর (প্রকৃতপক্ষে সালটা হবে ১৯৭৪) আমার বইগুলো ওখানে আর প্রকাশিতই হয়নি, তার মূল কারণ রাশিয়ার চেকোচোস্লোভিয়া দখল, তখন আমি আমার নিজের বক্তব্যটা খুব শক্তভাবেই প্রকাশ করেছিলাম।
সাক্ষাৎকারী: তখন কি আপনি প্রাগেই ছিলেন? 

ব্যোল: হ্যাঁ, আমি যখন সেখানে ছিলাম তখনই সেখানে আক্রমণ শুরু হয়ে গিয়েছিল। আমার চেক বন্ধুদের সঙ্গে থেকেই আমি সেই অভিজ্ঞতা নিচ্ছিলাম। আমার দৃষ্টিভঙ্গি, আমার সাক্ষাৎকার এবং আমার লেখালেখিতে এইসব ব্যাপার এতই দ্ব্যর্থহীন ছিল যে, দীর্ঘ সময়ের জন্য আমি যেন 'বাজে ছেলে'-তে পরিণত হই। '৭২-এ রাশিয়া থেকে আমার গল্পের ছোট্ট একটা সংগ্রহ বের হয়েছিল, তারপর আর কোনও বই বের হয়নি। বিক্রির জন্য আমার একটা বইও ছিল না সেখানে, মস্কোর কালোবাজার ছাড়া।
সাক্ষাৎকারী: আর এর পেছনের কারণটা ছিল, সলঝেনিৎসিন মুক্তি পেলে আপনি তাকে স্বাগত জানালেন। তিনি যখন বের হয়ে এলেন, কেউই তার সাহায্যে এগিয়ে আসেননি।

ব্যোল: খুব সম্ভবত, ব্যাপারটা তা নয়, আর সকলেই তখন এগিয়ে এসেছিলেন। এমনকি সলঝেনিতসিন যখন থেকে সবার সঙ্গে এখানে এসে থাকতে শুরু করলেন, আমিও তখন সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিলাম। আমি এখনও মাঝে মাঝে সেখানে ঘুরতে যাই।
 

সাক্ষাৎকারী: আমার ধারণা রাশিয়ায় আপনার কাছে বেশ টাকাপয়সা ছিল। 

ব্যোল: না, না, এমন কোনও ব্যাপার নয়, আমার কাছে যা ছিল তা খুব বেশি তো অবশ্যই নয়, অল্প কয়টা টাকা ছিল। 

সাক্ষাৎকারী: আপনি কিন্তু বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় অনূদিত হয়েছেন। একজন লেখকের জন্য তার রচনার অনুবাদকদের কোন দিকটি গুরুত্বপূর্ণ? আপনি কি এ সম্পর্কে সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন?

ব্যোল: অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি শুধু তাকেই বিচার করতে পারি আর তা হল আমার লেখার ইংরেজি অনুবাদগুলো। এবং হয়তো তা যথাযথ অনুবাদও হয়নি, তবুও। আমার সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক যোগাযোগটা হয়ে থাকে আমার অনুবাদকদের সঙ্গে। কোনও একটি পরিচ্ছেদ সম্পর্কে তাদের সংবেদনশীলতা দেখে আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ি, এমনকি অনুবাদক যদি ভাল জার্মান না জানে, তবুও তাদের অনুবাদে ব্যর্থতার ব্যাপারটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। অবশ্য, রুশ অনুবাদকরা কখনোই আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেননি, কিন্তু ফরাসি, ইটালিয়ান আর ইংলিশ অনুবাদকরা যথাযথভাবেই যোগাযোগ করেছেন, যার কারণে অনেক ভুল বোঝাবুঝি দূর হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের অস্পষ্টতা কেটেছে। ভুলগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া গেছে- আর এই ব্যাপারগুলো আমাকে অনেক আনন্দ দিয়েছে।

সাক্ষাৎকারী: আমার মনে হয় যে এইসব কাজ থেকে আপনি নিজেও অনেক কিছু আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন। 

ব্যোল: হ্যাঁ, শিখেছি তো অবশ্যই। কারণ, আপনাকে ঐতিহাসিক বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা করতে হবে। বিশেষ করে, এই ব্যাখ্যাটা কিন্তু করতে হবে খানিকটা বিস্তারে গিয়ে। আপনাকে খুঁটিনাটি বিষয়গুলিকে বলতে হবে। নাৎসি আমলে এই কাজটা কিন্তু খুব জটিল ছিল। না, না, কাজটা আমার জন্য ছিল বেশ উপভোগ্য।

সাক্ষাৎকারী: আপনার লেখার কৌতুকপূর্ণ দিক সম্পর্কে কী বলবেন? 

ব্যোল: আমি কী ভাবছি? আপনি কী মনে করছেন সেটা বলেন। 

সাক্ষাৎকারী: আমি কিন্তু আপনার লেখায় খুব জটিল পরিস্থিতিতেও হাস্যরস খুঁজে পেয়েছি, যেমন- 'দ্য ক্লাউন'-এ আপনি টলিফোনের ওপার থেকে ক্লাউনটি বিভিন্ন জিনিসের গন্ধ পাচ্ছে।

ব্যোল: না, না। দুর্ভাগ্যবশত, তা কখনোই নয়। 

সাক্ষাৎকারী: তারপর হান্স শিনার কী করে এই ধারণা পায় যে সে টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকেও গন্ধ পেতে পারে? 

ব্যোল: আমি বলতে পারি না। 

সাক্ষাৎকারী: আপনি জানেন না।

ব্যোল: না, আসলেই না। হাস্যরস হচ্ছে সত্যিকার অর্থে ধরতে পারার পক্ষে খুবই কঠিন ব্যাপার, এই ব্যাপারটা কিন্তু অনিশ্চিত অর্থ কিংবা অভিপ্রায়বিশিষ্ট। বলা যায়- দ্ব্যর্থক। আপনি ধরতে পেরেও ধরতে পারছেন না। আবার, বুদ্ধি দিয়ে কখনোই আপনি হাস্যরসকে বুঝতে পারবেন না। সত্যিকারের হাস্যরসের এটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক। হাস্যরসিক কথকের হাস্যরস। এই ব্যাপারটা কিন্তু সাংঘাতিক হতে পারে। এটা আমাকে বিষাদগ্রস্ত করে ফেলে, কারণ এটা অনেকটাই কৃত্তিমতা দিয়ে ভরা। আপনি কোনোভাবেই সবসময় রসিকতায় পূর্ণ হতে পারবেন না কিন্তু পেশাদার রসিককে তা পারতে হয়। এটা হল একটা দুঃখজনক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ব্যাপার।
 

সাক্ষাৎকারী: ক্লাউনের কাছে তা কিন্তু মোটেও একই জিনিস নয়।

ব্যোল: ওহ না, মোটেও না। 

সাক্ষাৎকারী: তাহলে, একজন ক্লাউনের কাছে হাস্যরস ব্যাপারটা অনেকটাই অগভীর, ভাসা ভাসা। 

ব্যোল: হ্যাঁ, তা ঠিক কিন্তু এখানে একটু বিভ্রম আছে। অলীকতা আছে। মূল কথাটা কিন্তু এই- হাস্যরস হচ্ছে গভীর বিষণ্ণতা আর হতাশার প্রকাশ। অনেক ক্লাউনকে গভীর হতাশার মধ্যেও ভাঁড়ামি করতে হয়। অনেক ক্লাউন নিজেদেরকে শেষ করে দেয় উন্মাদ রোগে। আমি আসলেই বুঝতে পারছি না আপনি ঠিক কী খুঁজে পেয়েছেন, কী ভাঁড়ামি খুঁজে পেয়েছেন?
সাক্ষাৎকারী: আমার মনে আপনার বিদ্রুপ রচনা 'মুরকি'র সমস্ত নীরবতা' থেকে ডাক্তার মুরকি'র নীরবতাটুকুর কথাই বলছিলাম (বইটি বোলের ছোটোগল্পের সংকলন, জার্মান ভাষায় সেটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে আর ইংরেজিতে ১৯৬৩-তে।)। কিন্তু, সেটা আসলে কোনওভাবেই নীরবতা ছিল না ।

ব্যোল: হ্যাঁ, হতে পারে। 

সাক্ষাৎকারী: আর আপনার সেই গল্প- 'ছুঁড়ে-ফেলা লোকটি'। 

ব্যোল: হ্যাঁ, সেই লোকটি কিন্তু ভাল নয়, মন্দ, খারাপ। 

সাক্ষাৎকারী: মন্দ বা খারাপ সে হতেই পারে, আমার কথা হল যে আপনার গতিমুখটি কিন্তু সঠিক। নিশ্চিতভাবে, যে-সমাজে আমরা থাকি, সেখানে এরকম প্রচুর বিষয় আছে যাকে শুধু ছুঁড়েই ফেলা হয়। 

ব্যোল: একটা লিখিত রূপ আসলে। আমি ঠিক জানি না সেই ছুঁড়ে- ফেলা লোকটি'তে হাস্যরস আছে কি না। গল্পটা লিখতে গিয়ে আমাকে বেশকিছু সমস্যা তৈরি করে ফেলেছিলাম।
সাক্ষাৎকারী: লেখার শুরুটা কীভাবে হয়? একেবারে প্রথমে মনে কোন জিনিসটা আসে? এটা কি একটা কোনও ছবি- কিংবা একটি চরিত্র, বা বিশেষ কোনও পরিস্থিতি?

ব্যোল: লেখার শুরুটা আসলে একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে একজনকে দিয়েই হয় (বেশি হলে দু'জন) আর এভাবে শুরু হলেই লেখায় দেখা দেয় দ্বন্দ্ব এবং দুশ্চিন্তা। নানা রকমের উদ্বেগ। লেখায় পাঠকের 'দম নেবার অবসর' কিংবা লেখার দীর্ঘতা- এগুলি নির্ভর করে ঠিক কতগুলি চরিত্র জরুরিভাবে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তে চায়, তার উপর।
সাক্ষাৎকারী একটি লেখা এগিয়ে যেতে যেতে কি কখনও আপনার মূল ভাবনা থেকে সরে যায়? 

ব্যোল: ভাবনার পরিবর্তন? হ্যাঁ, আমার ক্ষেত্রে তো অবিরাম এই পরিবর্তন ঘটতে থাকে, লিখতে লিখতে খুব কম লেখাই আমি মূল ভাবনা পরিবর্তন না করে শেষ করতে পেরেছি। প্রতিটি লেখার ক্ষেত্রেই একটা ধারণাগত গাণিতিক ব্যাপার থাকে যা লেখাটির সীমারেখা নির্ধারণ করে থাকে- সাহিত্যকর্মটির দৈর্ঘ্য, ব্যাপ্তি কিংবা সংক্ষিপ্ততা আসলে নির্ধারিত হয় একটা ছবির জন্য ঠিক কোন আকারের ফ্রেমের দরকার, তার উপর।

সাক্ষাৎকারী: কার জন্য লেখেন? আপনার কি কোনও কল্পিত পাঠক আছে?

ব্যোল: আমার সেই 'অদেখা', 'কল্পিত পাঠকটি' অশিক্ষিত হতে পারে কিন্তু সেই পাঠকটির এমন এক দ্বিধান্বিত আশাবাদ আছে যে, মাঝেমাঝেই যে আশাবাদ নৈরাশ্যবাদীর রূপ ধারণ করে, হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। আমি এখনও, শুরু থেকেই মনে করি- ভাষা হবে এই পাঠকটির সঙ্গে যোগাযোগের একটা উপায়। এমনকি, জটিল ও দুর্বোধ্য পরিস্থিতিতেও- হোক তা প্রবন্ধ কিংবা সমালোচনামূলক লেখা- ভাষা হবে অশিক্ষিত পাঠকের সঙ্গে একটা যোগাযোগ তৈরি করার উপযুক্ত।

সাক্ষাৎকারী: লেখালেখির ঠিক কোন দিকটি আপনার কাছে সবচেয়ে কঠিন? 

ব্যোল: হ্যাঁ, এইতো, আমার সেই অদেখা, কল্পিত পাঠকের কথা বিবেচনায় এনে, কোনও একটি বিষয়কে খুব সহজ করে ফেলে যাকে আসলে কোনোভাবেই সহজ বলা যায় না কিংবা প্রথমে যাকে খুব সহজে লেখার চিন্তা ছিল তাকেই পরে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দুর্বোধ্য করে ফেলা।

সাক্ষাৎকারী: নোবেল পুরস্কার কি আপনার জীবনকে কিছুটা বদলে দিয়েছে?

ব্যোল: যখন আমি নোবেল পুরস্কারটা পেলাম, নিজেকে বললাম যে এই পুরস্কারটা আমাকে না খুব চালাক করে ফেলেছে না অনেক বেশি নির্বোধ। নিজেকে আমি এটাও বলেছিলাম যে- এই আমরা, জার্মানরা, কখনওই কল্পনা শক্তিহীন লোক নই; এবং, এই পুরস্কারটা নিয়ে আনন্দিতই হয়েছিলাম। তবে, নোবেল আমার ব্যক্তিজীবনকে একটুও বদলায়নি। এটা বিশেষ কিছু সম্প্রদান করে, টাকা-পয়সার দিক থেকেও খুব একটা মন্দ নয়, কোনওভাবেই। কোলোন-এ, নোবেলের টাকায় যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের একটা এপার্টমেন্ট কিনেছিলাম; যাই হোক, সেখানে আমি কোনওদিনও থাকিনি।
সাক্ষাৎকারী: একটা লেখা শুরু করতে গিয়ে কি আপনি বিশেষ কোনও নিয়ম মেনে চলেন? 

ব্যোল: না, না, আমি যখন কোনও একটি বড় কাজে লেগে পড়ি, তখন আসলে তেমন কোনও বিশেষ আয়োজন থাকে না। সোজা লেখাটি শুরু করে দিই, যতক্ষণ না ক্লান্তি আর একঘেয়েমি জোর করে বন্ধ করে দেয়। আবার, ছোট লেখার ক্ষেত্রে আমি বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলি- ডেস্কে খুব ঋজু ভঙ্গিতে বসে আবারও ডেস্কটাকে ঠিকঠাক করে তুলি যাতে খুব সহজে ব্যবহার করা যায়। তারপর, খবরের কাগজ পড়ি, একটু হাঁটতে বের হই, ঘরের বইয়ের তাকগুলি গুছিয়ে ফেলি, চা কিংবা কফির মগে চুমুক দিই, যে- মহিলাটিকে আমি বিয়ে করেছি, তার সঙ্গে বসে। প্রচুর ধূমপান করি; তারপর, দর্শনার্থীদের সঙ্গে দেখা করবার জন্য প্রস্তুত হই, টেলিফোনে কথা বলি, এমনকি কিছুক্ষণ রেডিও শুনি- এসব করবার ঠিক পর মুহূর্তেই একেবারে সত্যিকার অর্থে শুরু করা বলতে যা বোঝায়, তা-ই করি : লাফ মেরে ট্রেনে উঠে পড়ি। আর এই কাজটা যদি আপনি করতে সক্ষম হন, তাহলে ট্রেনটাই আপনাকে স্টেশন থেকে স্টেশনে নিয়ে যাবে।

সাক্ষাৎকারী: স্টকহোমে, নোবেল গ্রহণকালে আপনি তো আপনার লেখার টেবিলটির কথা বলেছেন। এই ঘরে কি ওই টেবিলটি আছে? 

ব্যোল: না, এই ঘরে নেই, টেবিলটাকে আমার অন্য ঘরে লেখবার কালে ব্যবহারের জন্য রেখে দিয়েছি। 

সাক্ষাৎকারী: এই টেবিলটি ছাড়া কি আপনি লিখতে পারেন? 

ব্যোল: হ্যাঁ, হ্যাঁ, পারি, তবে ভাল করে পারি না। একমাত্র এই টেবিলটাতে বসেই আমি আমার সেরা লেখাটা লিখতে পারি। 

সাক্ষাৎকারী: এটা বেশ বড় একটা টেবিল? 

ব্যোল: না, বেশ ছোটো। তাই, অনেক বড়! 

সাক্ষাৎকারী: আর বক্তৃতায় যে টাইপরাইটারটির কথা বলেছিলেন?

ব্যোল: হ্যাঁ, সেই টাইপরাইটারটা তো এখনও আছে। ১৯৫৭ সালের তৈরি 'ট্রাভেলরাইটার ডিলাক্স'। তবে, এটা এখন বড় বেশি ঘট ঘট শব্দ করে আর আমি মাঝে মাঝেই ভাবি, জিনিসটা বুঝি আর বেশি দিন টিকবে না!

সাক্ষাৎকারী: তবে কি একটা বৈদ্যুতিক টাইপরাইটার কিনে ফেলবেন? 

ব্যোল: না না, নিজের কাছে একটা বৈদ্যুতিক মোটর নিয়ে আমি অন্তত লেখালেখির কাজ করতে পারব না। এই পুরোনো টাইপরাইটারটা সত্যিই আমার কাছে একটা বিশেষ যন্ত্র।

সাক্ষাৎকারী: একটা পেন্সিলের মতোই দরকারি কিছু? 

ব্যোল: হ্যাঁ, আমি আসলে বলতে চাইছি, এই যে তার ভয়ানক ঘট ঘট শব্দ... তার সঙ্গে আমি যখন লেখার কাজ করছি সে শব্দ করতে করতে এমনভাবে চলতে থাকে, মনে হয় ঘরে যেন একটি বাদ্যযন্ত্র বেজে চলেছে। আমি ভুলেই যাই যে আমি একটি মেশিনের সঙ্গে আছি!

সাক্ষাৎকারী: টাইপ করার সময় আপনি কি সবগুলো আঙুল ব্যবহার করেন? 

ব্যোল: না, না, সব নয়- ছয় কি সাতটা আঙুল ব্যবহার করি। আমি তো কখনোই শিখিনি যে ঠিক কীভাবে টাইপ করতে হয় আর তাই সব সময়ই ব্যাপক ভুল করতাম। যে-ভদ্রমহিলাকে আমি বিয়ে করেছি, তিনি সেই ভুলগুলোকে ঠিক করতেন, আবার আমি নিজেও করতাম। লেখাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত মূল লেখাটাকে আমি যেকোনওভাবে নিজ হাতে লিখে শেষ করি, কাউকে দিয়ে লেখাই না। টাইপরাইটারে লেখার ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই তৃপ্তিকর একটা প্রক্রিয়া, সৃষ্টিমুখর একটা ব্যাপার। এই যন্ত্রটা ব্যবহার করতে করতে আমি অভ্যস্থ হয়ে পড়েছি; কারণ এর রয়েছে চলার নির্দিষ্ট একটা ছন্দ। যন্ত্রটার শেষ বিদায়ের দিন আমার অসম্ভব কষ্ট হবে। কিন্তু একটা বৈদ্যুতিক যন্ত্র আমি কল্পনাও করতে পারি না। আমার লেখার টেবিলে বৈদ্যুতিক মোটরের স্থান হবে না কোনওভাবেই। মোটরটা একটু একটু গুনগুন করতে পারে- তাই না?
সাক্ষাৎকারী: স্টকহোমে, আপনার বলা সেই কথাটা মনে করিয়ে দিচ্ছি। আপনি বক্তৃতায় বলেছিলেন যে ভাষা এবং কল্পনার শক্তি আসলে একই ব্যাপার। এই কথাটি দিয়ে আপনি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছিলেন?

ব্যোল: প্রতিটি শব্দের পেছনে যেন একটা পুরো দুনিয়া লুকিয়ে থাকে- এই ব্যাপারটাকে আসলে আমাদেরকে অবশ্যই কল্পনা করে নিতে হবে। আসলে, প্রতিটি শব্দের থাকে স্মৃতির এক বিপুল ভার। তবে, হ্যাঁ, এটা নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তির স্মৃতি নয়- পুরো মানবজাতির স্মৃতি। আসুন, আমরা একটা শব্দকে ভাবি। ধরুন, শব্দটা 'রুটি'। কিংবা- যুদ্ধ। আবার, এখন আসুন, আরও একটি শব্দকে ভাবি, ধরুন সেটা 'চেয়ার', কিংবা 'বিছানা' কিংবা 'স্বর্গ'। ভেবে দেখুন, প্রতিটি শব্দের পেছনে যেন পুরো দুনিয়াটা ঢুকে পড়েছে। আমার ভয় লাগে এই ব্যাপারটা ভেবে যে, শব্দের ভেতরে যে বিপুল স্মৃতি লুকিয়ে আছে তা না জেনেই বেশির ভাগ লোক শব্দকে এমনভাবে ব্যবহার করে, যেন খুব মামুলি কোনও কিছুকে তারা ছুঁড়ে ফেলছে! তবে হ্যাঁ, শব্দঘোরের এই ব্যাপারটা কবিতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যময়, কিংবা লিরিকের ক্ষেত্রে। গদ্যের চেয়ে কবিতায় শব্দের ব্যবহার অনেক বেশি প্রগাঢ়, অনেক গভীর। যদিও গদ্যের সঙ্গে কবিতার খুব বেশি দ্বন্দ্ব নেই, উদ্দেশ্য তো একই।
সাক্ষাৎকারী: আপনার রাজনৈতিক ও সামাজিক-সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় নিয়েই আমি আলরিখ মেইনহোফ-এর মতো সংস্কারপন্থি বিপ্লবীদের কথা ভাবছি এবং প্রেস সম্পর্কে আপনার সেই সমালোচনাগুলি নিয়েই ভাবছি- এতে করে তো আপনি আপনার সহকর্মী আর পরিচিত পরিমণ্ডলে জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন, এবং...

ব্যোল: ... হ্যাঁ, ব্যাপকভাবেই হারিয়েছি। 

সাক্ষাৎকারী: ... তাহলে কেন করতে গেলেন? 

ব্যোল: লোকের কাছে অপ্রিয় হবার জন্য আমি আসলে এসব বলিনি। তার আসল কারণ হল- যা নিয়ে এই এখন আমরা কথা বলছি, সেই শব্দ নিয়ে- হয়েছে কী, শব্দের কল্পনাশক্তিহীন ব্যবহার আমাকে বড় হতাশ করে। ভেবে দেখুন, আলরিখ মেইনহোফ এবং তাঁর কমরেডদের কথা একবার চিন্তা করে করে দেখুন। তাদের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ প্রমাণিত হবার আগেই তাদেরকে খুনি বলা হচ্ছে। এটাকে আমি অত্যন্ত নিষ্ঠুর আর নীতিবর্জিত ঘটনা হিসেবেই দেখছি। আমার কাছে মনে হল- এই ধরণের মিথ্যা অপবাদ আর এইসব অপরিণামদর্শী কাজের খুব বেশি চর্চা এখানে হচ্ছে। প্রধান প্রধান প্রকাশকরাই শুধু নয়, অন্যরাও বেপরোয়া হয়ে পড়েছে এইসব বাজে কাজে। নাৎসিদের হয়ে ইহুদি-বিরোধী প্রেস ক্যাম্পেইনের কথা আমার মনে পড়ে, শুধু টাই নয়, ক্যাম্পেইনটা ছিল কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে; এবং, পরবর্তীতে চার্চের বিরুদ্ধে। আসলে আমার আবেগ কিংবা সত্যিকার ক্রোধ-টা হল- আমার কথা বলবার সেই পদ্ধতিটি : এখানে থামুন! থামুন এবং দেখুন যে আমার মনোভাবটি কিন্তু সব সময়ই শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমি এক একটি শব্দকে বেছে নিই এবং দেখি যে শব্দটার পেছনে কোন অর্থ লুকিয়ে আছে, দেখি যে- শব্দের ভুল ব্যবহারে কী অঘটন ঘটতে পারে। আমার বেশ কয়েকজন সহকর্মী কিন্তু ব্যাপারটাকে বুঝতে পারেন না, তারা মনে করেন- হ্যাঁ ঈশ্বর! সে দেখছি সন্ত্রাসবাদীদের সমর্থন করে যাচ্ছে। বিষয়টা কিন্তু এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে না, তারা আমার লেখার ভেতর থেকেও এই সমর্থনের বিষয়টাকে খুঁজে পাচ্ছে! আমার লেখা থেকে বেশ কিছু শব্দকে তারা চিহ্নিত করেছে, যা আমাকে আর আমার পরিবারকে বেশ একটা জটিল পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু সবক্ষেত্রেই বিষয়টি কিন্তু শব্দের সঙ্গেই সম্পর্কিত হয়ে থাকছে। শব্দের এই ব্যাপারটা- যা আমাদের নিজেদের ইতিহাসেই আছে- ভাষার সঙ্গে মিশে গিয়ে ব্যক্তির সমস্ত চিন্তাকে অধিকার করে ফেলা! আমি এভাবেই বিবেচনা করছি। শুনুন, তরুণ থাকতে আমি নিয়মইত স্টুমার পড়তাম এবং সেটা ছিল সেই কুতসিত নাৎসিদের প্রচারণা-পত্র, যারা শুধুমাত্র ইহুদিদেরকেই তাদের উদ্দেশ্যমূলক বাজে প্রোপ্যাগান্ডা চালানোর বিষয়ই করেনি, অন্যান্য সামাজিক গোষ্ঠীগুলোরও বিরুদ্ধে লেগেছিল- সমকামীদের বিরুদ্ধে, ক্যাথলক যাজক আর শেষ পর্যন্ত- সরাসরি কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে। আমি আসলে এই মুহূর্তে খুবই স্পর্শকাতর হয়ে আছি। যখন আজকের দিকে একদল লোকের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হয় তাদের একেকজনের নাম নিয়ে নিয়ে, বিশেষ করে বিষয়টাকে যদি আমাদের নিজেদের ইতিহাসের আলোয় দেখি, দেখব যে- কুৎসাকারীরা সবাই ছিল অতিমাত্রায় ঈর্ষাকাতর আর নিজেদেরকে অতি দ্রুত গণতন্ত্রী হিসেবে পালটে ফেলা লোক- এভাবে বলতে হবে- ১৯৪৫ সালের মার্চে তারা ছিল নাৎসি আর ১৯৪৫-এর অক্টোবরে তারা খুব দ্রুত নিজেদেরকে গণতন্ত্রীতে রূপান্তরিত করে ফেলে। আমি তাদেরকে অবিশ্বাস করি কিন্তু আমি এই ব্যাপারে আস্থাশীল যে গণতন্ত্র একটা বেশ দীর্ঘ প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করে। আপনি অতি দ্রুত কোনওভাবেই গণতন্ত্রী হতে পারবেন না। অনেক কিছুই এর সঙ্গে জড়িত থাকে। না, আমি বিষয়টাকে নিয়ে অনুতাপ করছি না, আক্ষেপ করছি না; হ্যাঁ, হয়তো আমি আমার ক্রোধ থেকে কিছু কথা বলেছি, পরে আমি নিজে নিজেই বুঝতে পেরেছি, উপলব্ধি করেছি যে- এইসব দুঃখজনক প্রচারণাসহই আমরা গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যেতে পারি, এগিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটা খুব জরুরি।
সাক্ষাৎকারী: আপনি কি মনে করেন যে সত্যকে খুঁজে পাওয়া কষ্টকর, এমনকি সত্য যখন বিদ্যমান থাকে ঠিক তখনও? কেউ একজন কীভাবে সত্যকে খোঁজেন? কী মনে করেন, উপন্যাসে কি সত্য লুকিয়ে থাকে, উদাহরণস্বরূপ বললাম?

ব্যোল: হ্যাঁ, উপন্যাসে থাকতে পারে, মানবীয় সত্য। বহু সংখ্যক উপন্যাস আছে যেগুলি পাণ্ডিত্যপূর্ণ বইপত্রের চেয়েও গভীরতাস্পর্শী ভাব ধারণ করে অনেক বেশি। একটা উদাহরণ দেবার দরকার : দক্ষিণ আমেরিকায়, আর্জেন্টিনার সাবাতো থেকে গুয়েতেমালার আস্তুরিয়াস পর্যন্ত বিস্তৃত জায়গাটিতে অনেক লেখক আছেন, মারিয়ো ভারগাস ইয়েওসা, গারসিয়া মার্কেসের মত আরও অনেক, তারা সংখ্যায় একশোরও বেশি- এইসব মহৎ লেখকদের মধ্য দিয়েই এই উপমহাদেশটির মানুষের গভীর ধ্যান ও ধারণাগুলি সত্যের আলোক স্পর্শে উদ্ভাসিত হয়েছে। আমি নিজেকে লেখক হিসেব সীমাবদ্ধ করছি না কিন্তু, তবে, বিষয় হল- সত্যকে অবশ্যই জোড়া দিয়ে দিয়ে একসূত্রে মিলিয়ে দিতে হবে। যুদ্ধোত্তর জার্মানীতে- ১৯৪৫ থেকে ১৯৬০ কিংবা '৭০, খুব স্বাভাবিকভাবেই, একটিমাত্র উপন্যাস আপনাকে কিন্তু সত্যের ধারণা দিতে পারবে না কোনোভাবেই, কিন্তু বিশটি উপন্যাস তা দিতে পারবে, যেমন- ক্রিসটা উলফের 'প্যাটার্ন্স অব চাইল্ডহুড', গুন্টার গ্রাসের 'দ্য টিন ড্রাম' এবং ওউই জনসনের উপন্যাস- কোয়েপ্পেন। একটা দুইটা আমরা উপন্যাসগুলির সংখ্যা গুণতে পারব না কিন্তু তারা সম্ভবত, সবাই মিলে ইতিহাসের বৈশিষ্ট্যসূচক সেই সত্যকেই লিখেছেন। ইতিহাস ও উপন্যাস (ফিকশন) অবশ্যই একে অপরকে শ্রদ্ধা করবে। আর এর সঙ্গে এসে মিলে যাবে চিত্রকলা, সঙ্গীত, বিশেষ করে স্থাপত্যকলা... ইতিহাসের কোনও একটি সময়ে যা কিছুই উৎপাদিত হয় তা-ই তার অংশ হয়ে যায়। সত্য অবশ্যই অস্তিমান, তবে তার খণ্ডিত অংশগুলিকে মেলবন্ধনে মেলানো বড় কঠিন, এই সত্য সব সময়ই একটি অংশে অংশে মিলিত সত্য, ঐতিহাসিক লেখাপত্র সেই সত্যেরই একটা অংশ, তবে আমি বিশ্বাস করি না যে ইতিহাস সম্পূর্ণ সত্যটিকে উপস্থাপন করতে পারে। যদি আপনি ছোটখাট চুরি কিংবা একটা ডির্ভোস কেইসের সত্যটাকে বুঝতে না পারেন, তবে ইতিহাস লিখতে গিয়ে আপনাকে একই সমস্যায় পড়তে হবে, তার উৎসের সন্ধান করতে গিয়ে।
সাক্ষাৎকারী: উৎস সম্বন্ধে আপনাকে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে। 

ব্যোল: উৎস জানতে বিশদ জেরা করতে থাকুন, প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে থাকুন। অফিসের অধিকারিক ব্যক্তিটি কী লিখলেন, কীভাবে সাজিয়ে লিখলেন- ভাষাগত অভিব্যক্তি হল নিষ্পত্তিকারক- তিনি কি লিখতে গিয়ে কিছু একটা বাদ দিয়ে দিলেন? তবে বেশি কিছু অবশ্য বাদ পড়ে না।
সাক্ষাৎকারী: একটা শব্দের অর্থ এবং সেই অর্থের সত্যের গুরুত্ব সম্পর্কে আপনি বলে থাকেন। শব্দগুলি কি কখনোই অযাথার্থিক হবে না শেষ পর্যন্ত?

ব্যোল: ভাষা- সঙ্গীত ও চিত্রকলার চেয়েও বেশি সারবান, পূর্ণগর্ভ। তবুও, তা 'যথাযথ' এমন নয়। কিন্তু আসল ব্যাপারটা হল- একটা শব্দের বহুসংখ্যক অর্থ থাকে, শুধুমাত্র একটা ভাষার অন্তর্গত হয়েই শুধু নয় ভাষা থেকে বের হয়েও সে অর্থময়, সুতরাং এই ব্যাপারটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে হবে যে শব্দ আর ভাষার মূলে গিয়ে তাকে অর্থকে বের করে আনা। এই ব্যাপারটাই হল সাহিত্যের সবচেয়ে ধ্রুব প্রয়াস। পরম অর্থ অন্যকোথাও অস্তিমান থাকুক; যে অর্থটিকে আমরা এখনও খুঁজে পাইনি।
সাক্ষাৎকারী: কোন বিষয়টি আপনাকে লেখার কাজে আটকে রাখে? 

ব্যোল: হ্যাঁ, ভাষায় কোনও বিশেষ কিছুকে প্রকাশের আকাঙ্ক্ষার কথাই প্রথম বলব। কিন্তু এখানে রয়েছে নানামুখি প্রবর্তনা। আছে না? এটা হল সম্পূর্ণরূপে ভাষাবিজ্ঞানের ব্যাপার। একটা বাক্য কিংবা একটা বিশেষ পরিস্থিতি- আমার মধ্যে জন্ম নেয়।
সাক্ষাৎকারী: লেখার নাম কি আগেই ঠিক করে লিখতে শুরু করেন? 

ব্যোল: না। লেখার নামটা আসলে লেখা শেষ করবার পর আসে, সাধারণত কিছু সংশোধনমূলক সমস্যার কথা চিন্তা করেই এরকম হয়, নামটা পরে আসে। আমার মনে আছে 'দ্য ট্রেন ওয়াজ অন টাইম' লেখাটার নাম কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্নরকম কিন্তু লেখাটার পূর্বনাম ছিল 'বিটুইন লেমবার্গ টু ঝিরনোইতজ। প্রকাশক বললেন- 'হায় ঈশ্বর, এ তো দেখছি দুইটি জায়গার নাম।' আমাকে নাম বদলাতে বলা হল, কিন্তু আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে নয়; আমি নাম বদলে ফেললাম। লেখার ভিত্তি নামটি প্রায় সময়ই বদলে যায়।
সাক্ষাৎকারী: আপনার প্রতিদিনকার লেখালেখির কথা বলতে বললে কী বলবেন? 

ব্যোল: আমার? বিগত কয়েকটি বছর আমার জন্য বেশ কষ্টের ছিল, এর কারণ দীর্ঘদিন আমি অসুস্থ ছিলাম আর এখনও আছি। আমি লিখি সকালের দিকে, নাস্তা খেয়েই শুরু করি আর কাজটা চলতে থাকে সাড়ে বারোটা পর্যন্ত। তারপর কিছুটা বিরতি নিয়ে বিকেল পর্যন্ত; এবং সন্ধ্যাতেও লেখার কাজটা চলতে থাকে। তবে সন্ধ্যার ব্যাপারটা হল যদি খুব কাজের ইচ্ছেটা খুব তীব্র থাকে। দুভাগ্যবশত, কিছু গুরুত্বহীন ব্যাপার ঘটে যায়, কেউ না কেউ হস্তক্ষেপ করেই ফেলে, আর তাতেই চলতে থাকা কাজটাই কঠিন হয়ে পড়ে।
সাক্ষাৎকারী: আপনি কি পুনঃপাঠ ও সংশোধন না করেই একনাগাড়ে লেখেন? 

ব্যোল: ওহ না, না, না, আমি একটা লেখার আগাগোড়া বার বার দেখি। বার বার ঠিক করি আর শুধু- বদলাই, এমনকি আমার নিজের বক্তব্য-প্রকাশক খুব ছোট একটা গদ্যও, তা মাত্র টাইপ করা দুই পৃষ্ঠাই হোক না কেন- চার থেকে পাঁচবার সংশোধন করি।
সাক্ষাৎকারী: লেখাটি সম্পূর্ণ শেষ হবার পরই কি পড়ে দেখেন? 

ব্যোল: হ্যাঁ, দেখি; তারপর দরকারি সংশোধনটুকু করি কিংবা নোট লিখি পেনসিল কিংবা বলপয়েন্ট দিয়ে, তারপর আবার কাজে লেগে যাই, ঘষামাজা করি, দরকারি সংযোজন করি। তবে, দুর্ভাগ্যবশতঃ এটা ঘটে কালেভদ্রে, আর খুব দ্রুতই কথাগুলি লিখে ফেলি। অবশ্যই, কাজটা চটপট করতে হয় না হলে হয়ত চূড়ান্ত কথাটি পরে আর ধরা দেবে না। মাঝেমাঝে আমি লিখতে শুরু করি আর হঠাৎ করে ভাবনাগুলিও চলে আসে, সে হয়তো তৃতীয় পৃষ্ঠাতেই; আমি সব ছেড়ে লিখতে ডুবে যাই আর লেখাও এগিয়ে চলে। লেখালেখির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ার পক্ষে এর চেয়ে ভাল কিছু আর হয় না। লিখতে শুরু করার একেবারে প্রথম দিকে এমন অনেক কিছুই লেখাটির অনুষঙ্গে ঘটতে থাকে, যা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করলে সেগুলি আবারও ফিরে আসে।
সাক্ষাৎকারী: চরিত্রদের নামের প্রসঙ্গে আসি, এই নামগুলি কি আপনার কাছে খুব তাৎপর্যপূর্ণ? 

ব্যোল: হ্যাঁ, হ্যাঁ, খুব। মানে অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ। আমি তো লেখাটা শুরুই করতে পারি না যদি তাদের নাম আমি না জানি। এটাই আমার এখনকার সমস্যা। আমার মনে একটা ছক থাকে, তা যে কোনও লেখা নিয়েই হতে পারে, হয়তো উপন্যাস। তখন আসলে আমাকে পাঁচ থেকে ছয়টি নাম অবশ্যই মনে রাখতে হয়, যা এখন আর সম্ভব হয় না। অবশ্যই আমি নিজেকে নিজেই নামগুলি মনে রাখতে সাহায্য করি- এটা এমন কঠিনও নয়- সবগুলি নামকে একটা নামেই ভাবতে শুরু করি। তাদের সবার ডাকনাম হয় একটা। এটা করি কেবলমাত্র লেখাটাকে এগিয়ে নেবার জন্য। তবে নাম নিয়ে আমি আসলে খুব বেশি ভাবিত হই না।
সাক্ষাৎকারী: আপনার লেখায় মানে ছাড়া চরিত্রের নাম নেই এমন কিছু আছে কি? নামটি যেখানে... 

ব্যোল: ... পেশা ভিত্তিক? না, আমি তো সেটা পছন্দ করি না। এরকম কিছু করাকে আমি আনাড়ি কাজ বলে ধরে নিই, কারণ আপনি একজন ব্যক্তিকে কোনও একটি নাম দিয়ে যা ইচ্ছা বিশেষায়িত করতে পারেন না। কোনও একটি নামকে একজন ব্যক্তির নির্দেশক করে ফেলা কিংবা বিশেষ অর্থবোধক করে ফেলাটা- একটা কদর্য ভুল। একজন ব্যক্তির নাম আমার কাছে সত্যিই খুব পবিত্র। অনেক কিছুই বরবাদ হয়ে যাবে সেই কারণে আমি কোনওভাবেই চরিত্রের জন্য নির্দিষ্ট নাম খুঁজি না। মাঝেমধ্যে আমি টাইপরাইটার চালাতে চালাতে পিয়ানোর মতো সুর সৃষ্টি করি, ঠিক যেমন করে কেউ পিয়ানো বাজায়। আমি ভাবি, এই বাজানোটা শুরু হল ডি দিয়ে, তারপর আমি ই-র উপর চাপ দিলাম, তারপর এন... এভাবে এগিয়ে যেতে থাকলাম। দেখা গেল চরিত্রটির নাম এই অক্ষরগুলি দিয়েই তৈরি হয়ে যাচ্ছে, বিপদ কিংবা সংকেত কিংবা ছায়া- এইসব আশ্চর্য সব নাম।
সাক্ষাৎকারী: আপনি কি কখনো লিখতে গিয়ে আটকে গেছেন, কিংবা লিখতে অসমর্থ হয়েছেন? আর যদিও তা হয়ে থাকেন, তাহলে সেই অবস্থাটি ঠিক কীভাবে কাটিয়ে উঠেছিলেন?

ব্যোল: লিখতে গিয়ে হঠাৎ আটকে যাওয়া কিংবা লিখতে না পারা- এই ব্যাপারগুলি কিন্তু এখন আমার দ্বিতীয় সত্ত্বার মত হয়ে উঠেছে। এর কারণটা কিন্তু বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। আমি এমন একট দেশে বাস করছি যে দেশটির ভাণ্ডারে রক্ষিত আছে দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি আণবিক মারণাস্ত্র- আরও নতুন নতুন আণবিক অস্ত্র দেশটির অস্ত্র ভাণ্ডারে যুক্ত হচ্ছে। এই ভয়ানক ব্যাপারগুলি আপনার নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেবে, আপনার জীবন-যাপনের আনন্দকে ধ্বংস করে দেবে। যে-লেখায় কোথাও ক্ষোভ কিংবা ক্রোধ থাকে, লেখায় কোনও একটা বিশেষ মানে তৈরি হয় সেই লেখাকেও বন্ধ করে দেয়। লেখককে থামিয়ে দেয়। কোনও সময় সঙ্গীত, বিশেষ করে ধ্রুপদি সঙ্গীত লেখা আটকে যাওয়ার হাত থেকে আমাকে বাঁচাত, যেমন- বিটোভেনের ব্রেদ, যা শুনলেই আমার ভেতর পশ্চিম-ইউরোপ আর রাইনের মতো স্থানের বোধ জেগে উঠত। লেখালেখির এই নির্দিষ্ট সমস্যাটি এমন অদ্ভুত যে আমি বুঝতেই পারি না ঠিক কেমন করে কোনও কিছুকে প্রকাশ করতে হয়; এমনকি যখন আমি একটা ছোট্ট রিভিউ লিখতে শুরু করি, আমার মনে হয় আবার সবকিছু নতুন করে পড়তে হবে। আমার কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
সাক্ষাৎকারী: কিন্তু সেটা কি একজন লেখকের জন্য খুব রক্তাক্ত উপলব্ধি নয়? 

ব্যোল: না, আসলে তা উপকারীই- লেখককে একটা ধরাবাঁধা অবস্থা থেকে বের করে আনে। 

সাক্ষাৎকারী আপনি এই পৃথিবীর কোন পরিবর্তনটি দেখতে ইচ্ছা করেন? 

ব্যোল: এই পৃথিবীর?

সাক্ষাৎকারী: হ্যাঁ। 

ব্যোল: একটা মাত্র প্রশ্নই আমাকে অবিরাম রক্তাক্ত করে চলে- কার জন্য এই পৃথিবীটা? 

সাক্ষাৎকারী আপনি কি নিজেকে একজন আশাবাদী মানুষ বলবেন? 

ব্যোল: আমি?

সাক্ষাৎকারী: হ্যাঁ। 

ব্যোল: আমি এক সঙ্গে দুই রকমের মানুষ। 

সাক্ষাৎকারী: একই সঙ্গে আশাবাদী আবার নৈরাশ্যবাদীও?

ব্যোল: আমার এই আশাবাদিতা কিন্তু একজন সারভাইভারের। জোর করে টিকে নিজেকে টিকিয়ে রাখবার অনুভূতিটা প্রায় সময়েই মারাত্মক আকার ধারণ করে যখন আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন অনেকেই ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। আমি এখনও সম্পূর্ণ টিকে আছি, এবং এখানেই আছি- এটাই হল আমার নিজেকে খাপ খাইয়ে চলবার শক্তি। আমি যে টিকে থাকবার লড়াইটা করছি তার একটা অনুভূতি। আজকের প্রজন্মের সমস্যাটা তাদের মধ্যে কিন্তু এই ব্যাপারগুলি নেই। কিন্তু তাদের বেলায়, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আঘাতটা পেয়েছে, পোল্যান্ডের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোয়,- যে নিপীড়ন চালান হয়েছিল; এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলি- বিবেকহীনতার সেই তীব্র সময়েও, তাদের মধ্যে ছিল একটা তীব্র আশাবাদ।



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। ২০২১ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। আপনিও কি তাই মনে করেন?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ