২৫ এপ্রিল ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৬ষ্ঠ বর্ষ ১৪ম সংখ্যা: বার্লিন, রবিবার ০২এপ্রি – ০৮এপ্রি ২০১৭ # Weekly Ajker Bangla – 6th year 14th issue: Berlin, Sunday 02 Apr – 08 Apr 2017

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রক্ষা করলে নতুন প্রজন্ম ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে

বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

প্রতিবেদকঃ ডয়েচে ভেলে তারিখঃ 2017-04-05   সময়ঃ 19:11:39 পাঠক সংখ্যাঃ 29

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে পরিগণিত৷ বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস, জাতিসত্ত্বা বিকাশের সুদীর্ঘ পথ-পরিক্রমা উদঘাটনে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো অনন্য ভূমিকা পালন করছে৷

আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে প্রাচীন স্থাপত্য-বৌদ্ধবিহার, মন্দির, মসজিদ, সাধারণ বসতি, আবাসিক গৃহ, নহবতখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জমিদার প্রাসাদ অথবা রাজপ্রাসাদ, অসংখ্য প্রাচীন পুকুর ও দীঘি শানবাঁধানো ঘাট, পানীয় জলের কুয়া, প্রস্তরলিপি, তাম্রলিপি, মূদ্রা, প্রাচীন পুঁথি-তুলট বা তালপাতায় লেখা, পোড়ামাটির ফলকচিত্র, পোড়ামাটি ও পাথরের ভাস্কর্য, মৃৎপাত্র ইত্যাদি৷  

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার এ দেশের ইতিহাস বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে৷ এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতি ও সিলেটের চাকলাপুঞ্জিতে পাওয়া প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার, মৌর্য যুগে এ অঞ্চলের প্রশাসনিক কেন্দ্র মহাস্থানগড় ও উয়ারি-বটেশ্বরে আদি ঐতিহাসিক পর্বের মানুষের বসতি চিহ্ন, নানা ধরনের মৃৎপাত্র, পাথর ও কাঁচের পুঁতি, পোড়ামাটির গুটিকা, স্থাপত্য কাঠামো চিহ্ন, ছাপাঙ্কিত মুদ্রা ইত্যাদি নানা রকম প্রত্ননিদর্শন৷ বরেন্দ্র অঞ্চলে পাল যুগে নির্মিত দক্ষিণ-এশিয়ার অনুপম স্থাপত্যকর্ম সোমপুর মহাবিহার বা পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বর্তমানে বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র হিসেবে স্থান করে নিয়েছে৷ পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের মূল মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির ফলকচিত্র এ দেশের মৃৎশিল্পীদের অনুপম শিল্পনৈপুণ্য প্রকাশ করে৷

 

এ দেশে পাথরের সংকটের কারণে নির্মাণ উপকরণ হিসেবে পাথরের বিকল্প হিসেবে পোড়ানো ইট এবং ফলকের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়৷ পাল আমলে বাংলায় বেশ কিছু বিহার স্থাপত্য নির্মিত হয়৷ সীতাকোট বিহার, ভাসুবিহার, জগদ্দল বিহার, শালবন বিহার, আনন্দ বিহার, হলুদ বিহার, বিক্রমশীলা মহাবিহার ইত্যাদি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এ অঞ্চলে বৌদ্ধ সংস্কৃতি বিকাশের অনন্য উদাহরণ৷

দিনাজপুরের কান্তনগরে মহারাজা প্রাণনাথ ও তাঁর পুত্র রাজা রামনাথ ১৭০৪ হতে ১৭০২২ সালের মধ্যে নির্মাণ করেন কান্তজীও মন্দির৷ বাংলার পোড়ামাটির শিল্পকর্মের এক বিরল দৃষ্টান্ত এই মন্দিরের দেয়ালে পোড়ামাটির শিল্পকর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি ও তৎকালীন সমাজ চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে৷ রাজশাহীর পুঠিয়ায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ শিব মন্দিরটি ১৮২৩ সালে রানী ভুবনময়ী নির্মাণ করেন৷ উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পুঠিয়া রানী সেখানে পঞ্চরত্ন গোবিন্দ মন্দিরটি নির্মাণ করেন৷ এছাড়া পুঠিয়াতে বড় আহ্নিক মন্দিরটি টেরাকোটার অলংকরণে দোচালা ও চারচালার সংমিশ্রণে তৈরি ত্রি-মন্দির, যেটি এ অঞ্চলের অনন্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন৷

 এছাড়াও বাংলাদেশের নানা জায়গায় অসংখ্য মন্দির স্থাপত্য জরাজীর্ন অবস্থায় রয়েছে৷ মন্দিরগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণ খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে৷

বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে প্রাচীণ মসজিদ স্থাপত্য৷ সুলতানী আমলের  অপূর্ব স্থাপত্য নিদর্শন চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছোট সোনা মসজিদ৷ সুলতান হুসাইন শাহের সময়কালে (১৪৯৩-১৫১৯) পনেরো গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি নির্মিত হয়৷ ইট ও পাথরের তৈরি এই মসজিদে পোড়ামাটির কারুকাজ রয়েছে৷ রাজশাহীর বাঘায় ১৫২৩ সালে নির্মিত বাঘা মসজিদ গুরুত্বপুর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন৷ এছাড়া মুন্সিগঞ্জের রামপালে মালিক কাফুর ১৪৮৩ সালে বাবা আদম শহীদের নামে একটি জামে মসজিদ নির্মাণ করেন৷ রাজশাহী জেলার দূর্গাপুর থানার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে দেখা যায় আমগ্রাম, কিসমত মারিয়া, কাঠালিয়া ও রইপাড়া গ্রামে মোঘলপরবর্তী যুগের ছয়টি মসজিদ স্থাপত্য৷ বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ৷সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহের শাসনকালে সুফি সাধক সেনাপতি খানজাহান আলী ১৮৪২ থেকে ১৪৫৯ সাল মধ্যে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন৷

মুঘল সুবা বাংলার রাজধানী ঢাকায় অনেক স্থাপত্যকীর্তি নির্মিত হয়৷কিন্তু কালের বিবর্তনে খুব কম সংখ্যকই আদিরূপে টিকে আছে৷ টিকে থাকা স্থাপত্যগুলোর মধ্যে মসজিদই প্রধান৷ তবে এ সব পূরনো মসজিদের সামগ্রিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়৷ অপরিকল্পিত সংস্কার ও সম্প্রসারণের কারণে বিনষ্ট হয়েছে অগণিত মসজিদের মূল বৈশিষ্ট্য৷ অনেকক্ষেত্রে ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোকে বিলীন করে আধুনিক রূপ দেয়া হয়েছে৷ যেমন ঢাকায় কালের আঘাত সহ্য করে টিকে থাকা সুলতানী আমলের প্রধানতম মসজিদটি হলো বিনত বিবির মসজিদ৷ ঢাকার নারিন্দায় অবস্থিত এই মসজিদটি সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহের শাসনামলে জনৈক মারহামাতের কন্যা বখত বিনত ১৪৫৬ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণ করেন৷ প্রকৃতপক্ষে নির্মাণকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই দীর্ঘসময় মসজিদের এতটাই পরিবর্তন হয়েছে যে, মসজিদের গায়ে শীলালিপিটিই প্রাচীনত্ব বোঝার একমাত্র সম্বল হয়ে পড়েছে৷ বর্তমানে মসজিদটি ত্রিতল ইমারত, যদিও আদিতে এটি ছিল এক গম্বুজ বিশিষ্ট বর্গাকৃতির মসজিদ৷

অপরিকল্পিত সংস্কার ও সম্প্রসারণে মসজিদের আদিরূপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অনন্য দৃষ্টান্ত এই মসজিদ৷ এছাড়া মুঘল আমলে ঢাকায় গুরুত্বপুর্ণ স্থান কাওরান বাজারে ১৬৭৭-৭৮ সালে নবাব শায়েস্তা খাঁর প্রধান আমাত্য খাজা অম্বর তিন গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যেটি খাজা অম্বর মসজিদ নামে পরিচিত৷ ১৭০৫ সালে  জনৈক খান মোহাম্মাদ মীর্জা  লালবাগে খান মোহাম্মাদ মৃধা মসজিদটি নির্মাণ করেন৷ সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে নির্মিত মতিঝিলের দিলখুশা মসজিদটি চিরাচরিত মুঘল স্থাপত্যরীতির তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ৷ মসজিদটি মুলত নবাব সলিমুল্লার ওয়াকফ স্টেটের অধীনে হলেও রাজউকের তত্ত্বাবধানে সৌন্দর্যবর্ধনের নামে সংস্কার কাজ করে আধুনিক মাত্রা দিয়ে মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও আবেদন নষ্ট করা হয়েছে৷ অষ্টাদশ শতকের প্রথম ভাগে আরমানিটোলায় মুঘল স্থাপত্যের অন্যান্য মসজিদের ন্যায়ে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট অলংকরণ বর্জিত সাদামাটা একটি মসজিদ নির্মাণ করেন মীর্জা গোলাম পীর৷ গোলাম পীরের মসজিদ নামে পরিচিত সেই মসজিদটি সংস্কারের পরে বর্তমানে ‘তারা মসজিদ' নামে পরিচিত৷

 

ঢাকার প্রাচীন মসজিদগুলোর ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় অপরিকল্পিত সংস্কার ও সম্প্রসারণের ফলে মসজিদগুলোর আদিরূপ ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিনষ্ট হয়েছে৷ আমাদের দেশের অধিকাংশ প্রাচীন মসজিদই স্থানীয় জনসাধারণের উদ্যোগে রক্ষণাবেক্ষণ হয়ে থাকে৷ ফলে সর্বসাধারণের অসচেতনতায় নানারূপ অপরিকল্পিত সংস্কার ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমে এসব মূল্যবান নিদর্শন বিনষ্ট হচ্ছে প্রতিনিয়ত৷ এর সাথে যুক্ত হয় সরকারি সংস্থাগুলোর অদক্ষতা, অবহেলা ও নির্লিপ্ততা৷

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন প্রত্যেক জাতির জন্যই অমূল্য সম্পদ৷ এ সম্পদ আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য এবং অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে৷ অথচ আমাদের দেশের এই মূল্যবান নিদর্শন সংরক্ষণের যথাযথ কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি৷ এরই ধারাবাহিকতায় ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের সাক্ষ্যমহামূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, প্রাচীণ স্থাপত্য কাঠামো ও প্রত্ননিদর্শন৷ এগুলোকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার কাজটি করে থাকে আমাদের জাদুঘরগুলো৷ যদিও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও গবেষণার জন্য যে জাদুঘর আমাদের রয়েছে সেগুলো এখনো উনিশ শতকে পড়ে আছে৷

এগুলোকে প্রকৃত অর্থে জাদুঘর না বলে উন্মুক্ত গুদাম বলা যায়৷ কারণ এগুলোতে কেবল সারিবদ্ধভাবে নিদর্শনগুলো প্রদর্শণের মাঝেই সীমাবদ্ধ রেখেছে তাদের কাজ৷ কিন্তু জাদুঘরকে আরও বেশি জনগণসম্পৃক্ত করতে হবে৷ নতুন নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকেন্দ্রিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে৷ দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সুরক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও জাদুঘরগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে৷ তাহলে নতুন প্রজন্ম দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে৷ ভালোবাসতে জানবে দেশের মুল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোকে ও এ দেশের আপামর মানুষকে৷

(সিকদার মো. জুলকারনাইন, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারি অধ্যাপক)

আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা না গেলে আমাদের ঐতিহ্যর ধারক ও বাহক এ সব অমূল্য নিদর্শন অচিরেই বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে৷ তাই এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করার এখনই সময়৷ সে জন্য জনসাধারণকে সচেতন ও সম্পৃক্তকরণ, প্রত্নবস্তু সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট আইনকে যুগোপযোগী করা, পেশাজীবী দক্ষ জনবল তৈরি করা, সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণে কাজ করা যেতে পারে৷ সর্বোপরি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের সচেতন ভূমিকা গ্রহণের মাধ্যমে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সুরক্ষায়, সংরক্ষণে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে৷

 

 



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। ২০২১ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। আপনিও কি তাই মনে করেন?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ