২৫ এপ্রিল ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৬ষ্ঠ বর্ষ ১৫ম সংখ্যা: বার্লিন, রবিবার ০৯এপ্রি – ১৫এপ্রি ২০১৭ # Weekly Ajker Bangla – 6th year 15th issue: Berlin, Sunday 09 Apr – 15 Apr 2017

ন্যায়বিচারের প্রতীক জাস্টিশিয়া খুন

মূর্তিপূজা ও বাঙালি অনুভূতি

প্রতিবেদকঃ মোনাজ হক তারিখঃ 2017-04-15   সময়ঃ 15:56:09 পাঠক সংখ্যাঃ 257

বাঙালী সমাজ - ন্যায়বিচারের প্রতীক “জাস্টিশিয়া” ভাস্কর্য বনাম মূর্তিপূজা সমাচার এই শিরোনামে এই লেখায় তিনজন ব্যক্তিত্ব ও তাঁদের কর্মের আলোকপাত করতেই আজকের এই আলোচনা।
শিল্পী নাসরিন আখতার চিত্রিত 'জাস্টিশিয়া

কে এই ভাস্কর যিনি ন্যায়বিচারের প্রতীক সৃষ্টি করেছেন?
ভাস্কর মৃণাল হক, জন্ম রাজশাহী ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮। একজন বাংলাদেশী ভাস্কর। ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢারুকলা ইন্সটিটিউটে ভর্তি হন। ১৯৮৪ সালে তিনি মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তিনি ঢাকার রাজসিক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গোল্ডেন জুবিলী টাওয়ার ভাস্কর্যের জন্য সর্বাধিক পরিচিত। রাজসিক ভাস্কর্য ঢাকার শেরাটন হোটেলের সামনে স্থাপিত ঐতিহ্যবাহী ঢাকার ঘোড়াগাড়ির প্রতিকৃতি। মৃণাল হক তাঁর শিল্পের মাদ্ধমে দেশে বিদেশে বাংগালী সংস্কৃতি কে পরিচিত করিয়েছেন ।
১৯৯৫ সালে মৃণাল আমেরিকাতে পারি জমান এবং সেখানে তার প্রথম কাজ শুরু করেন। নিউইয়ার্ক সিটিতে অবস্থিত বাংলাদেশের দুতাবাসে তার প্রথম প্রদর্শনি প্রদশিত হয়। তিনি নিউইয়ার্কে ভাস্কর এর কাজ করে এতো বেশি খ্যাতি অর্জন করেন যে, নিউইয়ার্কের সরকারি টিভি চ্যানেলে তার একটি সাক্ষাৎকার ২৬ বার এবং সিএনএন চ্যানেলে ১৮ বার প্রচারিত হয়।
২০০২ সালে মৃণাল দেশে ফিরে আসেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। একই বছর তিনি নিজ উদ্যোগে নির্মাণ করেন মতিঝিলের বক ভাষ্কর্যটি । ২০০৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে নির্মিত গোল্ডেন জুবিলী টাওয়ার তারই শিল্পকর্ম। ঢাকায় অবস্থিত মৃণাল হকের ভাস্কর্য শিল্পের মধ্যে আরো উল্লেখযোগ্য শিল্প দুর্জয় -রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও ঢাকা বিমানবন্দরের লালন ভাস্কর্য।
সুপ্রিম কোর্টের সামনে স্থাপিত ন্যায়বিচারের প্রতীক ভাস্কর্য ‘জাস্টিশিয়া’ প্রসঙ্গে মৃণাল বলেন,
‘এটা কোনো গ্রিক দেবীর মূর্তি নয় বরং বাঙালি নারীর ভাস্কর্য। ন্যায় বিচারকের ভূমিকায় বাঙালি নারীর অবয়ব দেখাতে চেয়েছি এই ভাস্কর্যে। বিশ্বজুড়ে বিচারালয়ে ন্যায় বিচারের প্রতীক হিসেবে একটি ভাস্কর্য প্রচলিত আছে। উচ্চ আদালত কর্তৃপক্ষ সেই ভাস্কর্যটির মতো একটি ভাস্কর্য এখানে বানাতে বলেছিলো। সেটা করলে আরও বেশি বিতর্ক হতো। তখন বলা হতো এই ভাস্কর্য আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে যায়না। তাই বিতর্ক থেকে মুক্ত থাকতেই বাঙালি নারীর বেশে ভাস্কর্যটি তৈরি করি”- ‘জাস্টিশিয়া’
জাস্টিশিয়া’র চোখ বাধা অর্থাৎ বিচারে ধনী গরিব সকলেই সমান। একহাতে নিক্তি অর্থাৎ ন্যায় বিচার, অন্য হাতে খড়গ অর্থাৎ দণ্ডাদেশ ও ন্যায়বিচারের অংশ। সুপ্রিম কোর্টের সামনে স্থাপিত ন্যায়বিচারের প্রতীক ভাস্কর্য ‘জাস্টিশিয়া’ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। শিল্পীর ব্যাখ্যার ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে অপসারণের চেষ্টা চালাচ্ছে শফি আহাম্মেদের নেতৃত্বে হেফাজত-ই-ইসলাম নামক এক সংগঠন। জাস্টিশিয়া যে দেশে দেশে ন্যায়বিচারের প্রতীক, জনগণকে তা বুঝতে না দিয়ে ইসলামপন্থী কয়েকটি দল ও একে “মূর্তিপূজা” বলে আখ্যায়িত করছে। প্রধানমন্ত্রীকেও ভুল বোঝানো হচ্ছে। ভাস্কর্যটি সরানোর কথা ওঠার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় বইছে।
 
কে এই শফি আহম্মেদ যিনি তেতুল হুজুর নামেই লোকমুখে পরিচিত?
আল্লামা শাহ আহমদ শফী ১৯২০ সালে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানার পাখিয়ারটিলা গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। ১০ বছর বয়সে তিনি আল-জামিয়াতুল আহ্লিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ২০ বছর বয়সে (১৯৪১ সালে) তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসায় ভর্তি হন, উত্তর প্রদেশের শাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক স্থানে এই মাদ্রাসার অবস্থান
দেওবন্দি আন্দোলন কি?
১৮৬৬ সালে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ইসলামি পণ্ডিত দেওবন্দ মাদরাসায় প্রতিষ্ঠা করেন। দারুল উলুম দেওবন্দের পণ্ডিতদের একটি বড় অংশ ভারত ভাগ করে দুই রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরোধিতা করেন ও আলেমদের সংগঠন জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের নেতৃত্ব দেন, দেওবন্দ পন্ডিতরা বিশ্বাস করেন-
'সবাইকে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য প্রয়াস চালাতে হবে যাতে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিষ্টান ও পারসিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এধরনের স্বাধীনতা ইসলামসম্মত।'
দেওবন্দ ধারা ইসলামের প্রাচীন রূপের পৃষ্ঠপোষকতা করে এবং যেকোনো প্রকার সহিংসতা থেকে নিজেকে দূরে রাখে।
অথচ আল্লামা শফি কি বলছেন - আল্লামা শাহ আহমদ শফী বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড এর চেয়ারম্যান, দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদরাসার মহাপরিচালক এবং চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে পরিচালিত সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এর আমীর।
দেওবন্দ দর্শনের সাথে হেফাজত-ই-ইসলাম কতটুকু যুক্তিসম্মত? কারণ হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিষ্টান ও পারসিরা অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলে দেওবন্দ।
যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও সাজা কার্যকরী করার দাবিতে ২০১৩ সনের ফেব্রুয়ারী তে যখন লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষ শাহবাগে একত্র হয় ও কিছু ব্লগার তাদের মুক্তমনা লেখার মাদ্ধমে প্রতিবাদ করে তখন ব্লগারদের শাস্তির দাবিসহ ১৩ দফা দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেন বহুল আলোচিত হেফাজতে ইসলাম ও আল্লামা শাহ আহমদ শফী। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বদানকারী কয়েকজন ব্লগারের বিরুদ্ধে রাসূল সা: ও ইসলাম অবমাননার মিথ্যা খবর প্রকাশিত হওয়ার পর হেফাজতে ইসলামের প্রতিবাদ কর্মসূচি সবার নজরে আসে। ইসলাম ও রাসূল অবমাননার সাথে জড়িত ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ব্যাপক জনসমাগমে বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদী অবস্থান, মানববন্ধন, উপজেলা পরিষদ ঘেরাও এবং স্মারকলিপি প্রদানসহ হেফাজতে ইসলামের বেশ কিছু কর্মসূচি পালিত হওয়ার পর দেশের সব জেলা থেকে ঢাকা অভিমুখী লংমার্চ ও মহাসমাবেশ কর্মসূচি পালিত হয়েছে ৫ মে । এর সাথে হাসিনা সরকারের পতনের কর্মসূচি ও একত্র হয় ৫ মে গভীর রাতে অবশেষে সরকার মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে পুলিশি হামলায় হেফাজতি ইসলাম কে ছত্রভঙ্গ করেদেয়। এ নিয়ে পরবর্তীতে সরকারকে দোষারুপ করা হয় হাজারে হাজার হেফাজত কর্মীকে হত্যা করেছে বলে, এটিও তাদের একটি মিথ্যাচার।
সমালোচনা
কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত খবর এবং কিছু সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় আহমদ শফী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে, হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহায়তা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতার উদ্দেশ্যে রাজাকার বাহিনী গঠন করেছিলেন। যদিও হেফাজতে ইসলামের পক্ষে সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল জুনায়েদ বাবুনগরী শফীর বিরুদ্ধে আনীত এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং ষড়যন্ত্র মুলক বলে অস্বীকার করেন।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকায় আহমদ শফীর দেয়া একটি ধর্মীয় বক্তৃতায় নারীদের প্রতি অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার ও তাদের শিক্ষাগ্রহণের নিরুত্সাহিত করার নির্দেশ দানে বিভিন্ন নারী সংগঠন, বিশিষ্ট নাগরিক সমাজ এবং জনসাধারনের মাঝে ব্যপক সমালোচনার সৃষ্টি করে[ এবং তার বিরুদ্ধে নারী অবমাননার অভিযোগ করা হয়; এমনকি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আহমদ শফীর এই বক্তৃতার সমালোচনা করেন।
 
আমার এই আলোচনায় তৃতীয় ব্যক্তি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কি তাঁর পরিচয়?
আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ডিগ্রী ধারী, বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী জনগণের সেবায় দেশ পরিচালনা করছেন, যে দেশ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শে উন্নতির সিঁড়িতে উপরে উঠছে।
এই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি এখন দেওবন্দ আদর্শে দীক্ষা নিলেন?
প্রধান মন্ত্রীকে বোঝানো হয়েছে যে ন্যায়বিচারের ভাস্কর্য স্থাপন করা মূর্তিপূজার সামিল। প্রধানমন্ত্রী যদি শফি হুজুরের ভুল ব্যাখ্যা "মূর্তিপূজা" না ভেবে ভাস্কর মৃণাল হক এর সাথে কথা বলতেন তাহলে এই ন্যায়বিচারের প্রতীক সম্পর্কে সত্য ঘটনা জানতে পারতেন।
আর তাই প্রধানমন্ত্রী বলেন,
“আমাদের হাইকোর্টের সামনে গ্রিক থেমেসিসের এক মূর্তি লাগানো হয়েছে। সত্য কথা বলতে কী, আমি নিজেও এটা পছন্দ করিনি। কারণ গ্রিক থেমেসিসের মূর্তি আমাদের এখানে কেন আসবে। এটাতো আমাদের দেশে আসার কথা না। আর গ্রিকদের পোশাক ছিল একরকম, সেখানে মূর্তি বানিয়ে তাকে আবার শাড়িও পরিয়ে দেয়া হয়েছে। এটাও একটা হাস্যকর ব্যাপার করা হয়েছে।”
শেখ হাসিনা বলেন, এটা কেন করা হলো, কারা করল, কীভাবে- আমি জানি না। ইতিমধ্যেই আমাদের প্রধান বিচারপতিকে আমি এই খবরটা দিয়েছি এবং খুব শিগগিরই আমি ওনার সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে বসব। আলোচনা করব এবং আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটা এখানে থাকা উচিত নয়।
প্রধানমন্ত্রীর কথায় যদি ন্যায়বিচারের প্রতীক সরিয়ে নেওয়া হয় তা হলে সেটিও ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে, আর হেফাজত তাদের ১৩ দফার বাস্তবায়ন আরো জোরে গতিতে চালাবে। ১৩ দফার ৪ টি এর মধ্যেই মেনে নেওয়া হয়েছে - প্রাথমিক ও মেধমিক স্কুলের বাংলা সাহিত্যের বই থেকে ১৭ টি প্রবন্ধ ও কবিতা বাদ দিয়ে ইসলামী চিন্তাধারার রচনা সংযোজন করা হয়েছে এটি হেফাজতি ইসলামের দাবি ছিল, হেফাজতের লিস্ট থেকে ৮৪ জনের ব্লগার এর প্রায় অর্ধেক হত্যা করা হয়েছে বাঁকি অর্ধেক দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
জাস্টিশিয়া’
‘জাস্টিশিয়া’ এখন অপমানিত ও পরাজিত। তার পোশাকি আবরণ লুন্ঠিত হয়ে পড়েছে। সে ফিরে চলে যাচ্ছে। তার হাতের বিচারের নিক্তি এখন আর সমান্তরাল নেই, বিচারের খড়গ এখন তার নিজের কাঁধেই বসিয়ে দিয়েছে ওরা। যে দেশে ন্যায়বিচারের সিম্বলকে মূর্তিপূজার সাথে এক করে দেখা হয়, বিনা বিচারে ব্লগার হত্যা করা হয় সে দেশে জাস্টিশিয়া'র প্রয়োজন নেই।
জাস্টিশিয়া ছবিটির শিল্পী: নাসরিন আখতার
(উইকিপেডিয়া ও বিভিন্ন বাংলা ব্লগ থেকে তথ্য সংগ্রহ)

 



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। ২০২১ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। আপনিও কি তাই মনে করেন?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ