১৯ নভেম্বর ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৬ষ্ঠ বর্ষ ৩৪শ সংখ্যা: বার্লিন, রবিবার ২০ আস্ট – ২৬ আস্ট ২০১৭ # Weekly Ajker Bangla – 6th year 34th issue: Berlin,Sunday 20Aug – 26Aug 2017

বার্লিনে রামপাল ও বিকল্প জ্বালানিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন

বার্লিনে রামপাল বিষয়ক দুই দিনব্যাপী সম্মেলন

প্রতিবেদকঃ রাশা মহিউদ্দীন ও দেবাশীষ সরকার তারিখঃ 2017-08-21   সময়ঃ 05:58:11 পাঠক সংখ্যাঃ 110

বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কার্যক্রম চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। সিডর ও আইলার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলের একমাত্র রক্ষাকবচ এবং সেই সঙ্গে লাখো বনজীবী মানুষের জীবিকার উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখে। রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ফলে সুন্দরবনের পাশাপাশি মানুষের জীবন ও জীবিকা সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। তাই শুধু দেশেই নয় বরং ইউরোপসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি পেশাজীবী, ছাত্র-শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা ব্যাপক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন এবং রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র না করার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে নানাভাবে উদ্যোগী হয়েছেন। বৈজ্ঞানিক তথ্যসংবলিত বিশ্লেষণের পাশাপাশি সভা-সমাবেশের মাধ্যমে এই তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রক্রিয়া বন্ধের দাবি দেশে-বিদেশে দিন দিন আরও জোরালো হচ্ছে। (বক্তব্য দিচ্ছেন প্রফেসর হার্টমুট বেয়ারউল্ফ, বাঁ থেকে তৃতীয়, মঞ্চে এলিজাবেথ স্টাউড, ক্লাইমেট এন্ড ডেভলপমেন্ট ফোরাম  ও প্রফেসর উইলফ্রেড এন্ডলিশার, বাঁ থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় এবং প্রফেসর আনু মুহাম্মদ)
ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানির নেতিবাচক দিকগুলো বিবেচনা করে ইতিমধ্যে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ নির্বিশেষে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা থেকে সরে এসে পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উপায় হিসেবে বিবেচনা করছে। রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বাঁচাবার দাবি ও বিকল্প জ্বালানিবিষয়ক সম্ভাব্য নীতি খুঁজে দেখার দাবি করেছে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ইউরোপীয় নেটওয়ার্ক।
গতকাল ১৯ ও আজ ২০ আগস্ট বার্লিন শহরের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার কেন্দ্রে এ বিষয়ে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ও বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনের শেষ দিন আজ রোববার রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল ঘোষণা করে সুন্দরবন বাঁচাতে বার্লিন ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়।
বক্তব্য দিচ্ছেন কেসটিন ডোরেনব্রুক, গ্রীনপিস, বার্লিন  

বার্লিনে রামপাল বিষয়ক দুই দিনব্যাপী সম্মেলনে বাংলাদেশে রামপাল প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব ও বাংলাদেশে বিকল্প জ্বালানির সম্ভাব্যতা নিয়ে চারটি সেশনে সর্বমোট আটটি প্রবন্ধ পাঠ করেন আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী জার্মানিসহ ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, হল্যান্ড, নরওয়ে ও জার্মানিতে বসবাসরত শিক্ষার্থী গবেষক ও পেশাজীবীরা এই বিষয়ে তাদের মতামত প্রকাশ করেন।
সম্মেলনে বক্তারা সুন্দরবনকে শুধু বাংলাদেশের নয়, তা বিশ্ব জল বৈচিত্র্যের সম্পদ বলে অভিহিত করেন এবং তা রক্ষা করতে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে তার প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেন অধ্যাপক ভিলফ্রেড এন্ডলিশার। বাংলাদেশে বিকল্প জ্বালানির বিশাল সুযোগ আছে বলে মনে করেন অধ্যাপক হার্টমুট বেরভোল্ফ। আনু মুহাম্মদ বাংলাদেশের তেল-গ্যাস নিয়ে বিগত সময়গুলিতে বিভিন্ন সরকারের গাফিলতির কারণে দেশীয় জ্বালানি ও পরিবেশ সম্পদের ক্ষতির বর্ণনা দেন। বাংলাদেশে বিকল্প জ্বালানিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাহবুব সুমন বাংলাদেশে বিকল্প জ্বালানির প্রয়োগ ও সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন।
বার্লিনে রামপাল ও বিকল্প জ্বালানিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বার্লিন ঘোষণাপত্রের সঙ্গে পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য বিষয়ক সংগঠন গ্রিনপিস, ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ, ৩৫০ অর্গানাইজেশন, ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড ফাউন্ডেশন, উইমেন এনগেজ ফর দ্য কমন ফিউচার, ব্যাংকট্রাকসহ সারা বিশ্বের প্রায় এক শ সংগঠন সংহতি প্রকাশ করেছে।
বার্লিন ঘোষণাপত্রে সুন্দরবনের কাছে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের কারণে অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভের সম্ভাব্য ক্ষতি, ভারত ও চীন বা এশিয়া ও ইউরোপের অন্যান্য দেশের উদাহরণ গ্রহণ করে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণসহ বাংলাদেশের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক প্রকল্পসমূহ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সম্মেলনের শুরুতে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ইউরোপীয় নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে সৈয়দ বাবুল ও মোস্তফা ফারুক শুভেচ্ছা বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশে চলমান রামপাল ও বিকল্প জ্বালানি বিষয় নিয়ে যে আলোচনা ও আন্দোলন চলেছে তার ব্যাপকতা ছড়িয়ে দিতে এবং সংহতি প্রকাশের লক্ষ্যেই এই ইউরোপীয় সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।
সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে ‘রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সুন্দরবনে পরিবেশগত প্রভাব’ শীর্ষক আলোচনাতে প্রবন্ধ পাঠ করেন গ্রিনপিসের কেসটিন ডোরেনব্রুক, বার্লিন বয়েথ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা গুডরুন কামাস ও পরিবেশবিষয়ক সাংবাদিক ক্যাথারিনা ফিঙ্কে। এই অধিবেশনটি পরিচালনা করেন পটসডাম জার্মান জিয়োসায়েন্স গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক ড. অনিমেষ গাইন।
সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে ‘কয়লা নির্ভর জ্বালানি নীতি, জলবায়ুতে তার প্রভাব এবং সবুজ জ্বালানি নীতিতে রূপান্তর’ বিষয়ক অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন বার্লিন হুমবল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভিলফ্রেড এন্ডলিশার, কোলন প্রযুক্তি কলা ও বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হার্টমুট বেরভোল্ফ, আনু মুহাম্মদ ও জার্মান পরিবেশ ফোরামের এলিজাবেথ স্টাউড। অধিবেশনটি পরিচালনা করেন বার্লিন হুমবল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞান বিষয়ক গবেষক ওয়াহেদ চৌধুরী।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ‘বাংলাদেশর জন্য সবুজ জ্বালানির সম্ভাবনা ও সম্ভাব্যতা’ শীর্ষক তৃতীয় অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন হ্যানোভারের লাইবনিজ ফলিত ভূ-পদার্থবিদ্যা ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান ও বাংলাদেশে বিকল্প জ্বালানিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাহবুব সুমন। এই পর্বের অধিবেশনটি পরিচালনা করেন বার্লিন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক তানজিয়া ইসলাম।
সম্মেলনের চতুর্থ অধিবেশনে ‘সুন্দরবন অঞ্চলে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল ও বাংলাদেশে বিকল্প জ্বালানির সম্ভাব্যতা নিয়ে আন্দোলন ও সংহতি প্রকাশের লক্ষ্যে ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অ্যাকটিভিস্টদের মধ্য মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। পর্বটি পরিচালনা করেন ড্রেসডেন হেল্মহোলজ গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক দেবাশীষ সরকার।
বার্লিন শহরের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার কেন্দ্রে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী রামপাল ও বিকল্প জ্বালানিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন চলাকালে সুন্দরবনের আলোকচিত্রের প্রদর্শনী করেন ফটো সাংবাদিক ডেভিড ওয়েন। পরে সুন্দরবন ও তার পরিবেশ বিষয়ক ডকুমেন্টারি চলচিত্র ও সাংস্কৃতিক প্রদর্শিত হয়।
সম্মেলনের মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের অভিজ্ঞতা, বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির বহুল প্রসার ইত্যাদি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ও অংশগ্রহণকারীদের মতামত বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বাস্তবসম্মত বিকল্প জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সর্বোপরি বিশ্ব মতামতকে সুন্দরবনের পক্ষে আরও সংহত করে সুন্দরবন রক্ষার দাবিকে আরও জোরালো করা সম্ভব হবে।
*রাশা মহিউদ্দীন ও দেবাশীষ সরকার, বার্লিন, জার্মানি। (সৌজন্যে: প্রথম  আলো)
 



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার রোহিঙ্গা দেরকে অত্যাচার করে ফলে ২০১৭ তে অগাস্ট ২৫ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ মাসে ৫ লক্ষ্য রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশ শরণার্থী দেরকে আবার ফিরে পাঠিয়ে দিক?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ