১১ ডিসেম্বর ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৬ষ্ঠ বর্ষ ৩৮শ সংখ্যা: বার্লিন, রবিবার ১৭সেপ্টে – ২৩সেপ্টে ২০১৭ # Weekly Ajker Bangla – 6th year 38th issue: Berlin,Sunday 17Sep - 23Sep 2017

হানিফা ডীনের 'দ্য ক্রিসেন্ট এন্ড দ্য পেনঃ দ্য স্ট্রেঞ্জ জার্নি অব তসলিমা নাসরিন' - ২

পুস্তক আলোচনা অনুবাদ সাহিত্য

প্রতিবেদকঃ ফরিদ আহমেদ তারিখঃ 2017-09-21   সময়ঃ 06:01:04 পাঠক সংখ্যাঃ 81

হানিফা ডীন পাঁচবার ঢাকায় এসেছিলেন তসলিমা নাসরিনের কাহিনি জানার জন্য। কথা বলেছেন তসলিমা সংশ্লিষ্ট বহু মানুষের সাথে। ফলে, তসলিমার বিদেশ যাত্রার এই বাংলাদেশি ভার্সনটা তাঁর জানা হয়ে যায় সহজেই। তসলিমার বক্তব্য এবং বাংলাদেশের মৌলবাদী ড্রাগনকে হত্যা করে তসলিমাকে যাঁরা বাংলাদেশ থেকে ‘উদ্ধার’ করে সুইডেনে নিয়ে আসেন, সেই সুইডিশ পেনের গল্পটা তাঁর জানা ছিলো না। এটা জানার জন্য স্টকহোমে যান তিনি। দেখা করেন তসলিমার সাথে, তসলিমার বাসাতেই।

প্রথম সাক্ষাতের বিদায়বেলায় হানিফা তসলিমার কাছে জানতে চান সুইডিশ পেনের কার সাথে তিনি কথা বলতে পারেন তাঁর বিষয়ে। সুইডিশ পেনের প্রেসিডেন্ট গ্যাবি গ্লেইচম্যান ছাড়া অন্য কারো নাম তিনি জানতেন না। গ্যাবির সাথে দেখা করবেন কিনা, এ বিষয়ে তিনি তসলিমার মতামত চান। তসলিমা তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, 'গ্যাবির সাথে দেখা করতে চাও কেন?' হানিফা এর ব্যাখ্যা দেন। কিন্তু, তসলিমা গ্যাবির পরিবর্তে সুইডিশ হিউম্যানিস্ট অর্গানাইজেশনের এক কর্তা ব্যক্তির নাম এবং টেলিফোন নাম্বার লিখে দেন। হানিফা ডীন প্রসঙ্গকে দীর্ঘায়ত না করে ফিরে আসেন তসলিমার ডেরা থেকে।

তসলিমার কাছ থেকে খুব একটা সাহায্য না পেয়ে সুইডিশ রাইটার্স ইউনিয়নের শরণাপন্ন হন হানিফা। এরা তাঁকে দুইজন বিখ্যাত সুইডিশ লেখকের নাম দেয়, যাঁরা পেনের সদস্য। এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন ক্যারোলা হ্যানসন। তিনি থাকেন স্টকহোম থেকে একশো কিলোমিটার দূরের উপসালাতে। হানিফা ডীনের সাথে সাক্ষাৎ করতে রাজি হন তিনি।

ক্যারোলার কাছ থেকেই হানিফা, তসলিমার বিষয়ে সুইডিশ পেনের অংশের গল্প জানতে পারেন। সুইডিশ পেন কীভাবে তসলিমার বিষয়ে অবগত হলো সে বিষয়ে ক্যারোলার ভাষ্য এরকম।

তসলিমার দুর্ভোগের খবর সুইডিশ পেনের কাছে আসে মূলত দুটো সোর্স থেকে। লন্ডন পেন এবং নিউ ইয়র্ক পেনের ইন্টারন্যাশনাল উইমেন’স কমিটি থেকে। লন্ডন পেন হচ্ছে পেন ইন্টারন্যাশনালের নার্ভ সেন্টার। এখান থেকেই ইনফরমেশনকে ছড়িয়ে দেওয়া হয় সারা বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এর শত শত সিস্টার কনসার্নের কাছে। পেনের সদস্যরা এবং এদের মিত্ররা মুক্তচিন্তার প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তসলিমার সৌভাগ্য, পেন তাঁকে নিয়ে মাথা ঘামানো শুরু করে, এবং এর বিশাল নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়ে ওঠে তসলিমাকে উদ্ধার করার জন্য। এই সৌভাগ্য অবশ্য পারস্পরিক। পেনেরও সৌভাগ্য যে তারা তসলিমাকে পেয়েছিলো।

হানিফা ডীনের ভাষ্যে, পেন এবং এর সদস্যরা পৌরাণিক কাহিনির মতো ড্রাগন শিকারির ভূমিকায় নেমেছিলো। আগুনমুখো ড্রাগনকে হত্যা করে বন্দিনী রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে হবে এবং সকলের প্রবল হর্ষধ্বনির মধ্য দিয়ে তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে আনতে হবে, এরকমটাই মনোভাব ছিলো তাদের।

তসলিমাকে উদ্ধারের সুইডিশ ক্যাম্পেইন শুরু হয় মার্চ মাসের শেষ দিকে কিংবা এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে। পাঠক, এই সময়ক্ষণটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগের পর্বে আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে তসলিমার ঝামেলার সূত্রপাত হয়েছিলো স্টেটম্যান পত্রিকার সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে। সেটা জুন মাসের ঘটনা। জুনের চার তারিখে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয় ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করার জন্য। দুই মাসের জন্য পলাতক জীবন বেছে নেন তিনি। কিন্তু, এর অনেক আগে থেকেই, যখন তিনি সত্যিকার অর্থেই বিপদাপন্ন নন, তখন থেকেই তাঁকে উদ্ধার করার মিশনে নামে সুইডিশ পেন। তসলিমাকে কুর্ট টুকোলস্কি পুরস্কার প্রদান করে তারা। সুইডেনে আমন্ত্রণ জানায় এই পুরস্কার নেবার জন্য। পুরস্কার মূল বিষয় না, এটার অছিলায় তাঁকে দেশ থেকে বের করে আনাটাই ছিলো তাদের মূল উদ্দেশ্য।

কুর্ট টু্কোলস্কি পুরস্কারটা বছরে একবার দেওয়া হয়, এবং এটা দেওয়া হয় মূলত বিদেশে নির্বাসিত কোনো লেখককে। কুর্ট টুকোলস্কি ছিলেন জার্মান লেখক। তিনি ফ্যাসিবাদের বিরোধী ছিলেন। এ কারণে তিরিশের দশকে জার্মানি থেকে তাঁকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসতে হয়। পালিয়ে এসে তিনি আশ্রয় নেন সুইডেনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সুইডেন নিরপেক্ষ দেশ ছিলো। কিন্তু, সুইডেনে প্রচুর লোক আছে, যারা প্রো-জার্মান। সে কারণে সুইডেনে পালিয়ে আসার পরেও কুর্ট টুকোলস্কির জীবনটা নিরুদ্বিগ্ন এবং সুখের ছিলো না। ১৯৩৫ সালে আত্মহত্যা করেন তিনি। তাঁর স্মরণেই এই পুরস্কার চালু করা হয় নির্বাসিত লেখকদের জন্য।

এর ব্যতিক্রম ঘটে ১৯৯৩ সালে। সালমান রুশদিকে কুর্ট টুকোলস্কি পুরস্কার প্রদান করা হয়। রুশদি নির্বাসিত লেখক ছিলেন না। স্যাটানিক ভার্সেস লেখার অপরাধে মুসলিম মৌলবাদীদের হুমকির মুখে জীবন সংশয়ে ছিলেন তিনি। প্রাণ বাঁচাতে আত্মগোপনে চলে যান তিনি। শারীরিকভাবে তিনি যদিও বা নির্বাসিত নন, কিন্তু পলাতক থাকার কারণে তাঁর মনন নির্বাসিত, এই যুক্তিতে কুর্ট টুকোলস্কি পুরস্কার প্রদান করা হয় তাঁকে। তসলিমা নাসরিনকে যখন এই পুরস্কার দেওয়া হয়, তখন তিনি পলাতকও না, নির্বাসিতও না। বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসার তিন মাস আগে, বাংলাদেশে পলাতক হবার এক মাস আগেই নির্বাসিত লেখকদের জন্য বরাদ্দ এই পুরস্কার পেন বোর্ড তাঁকে বরমাল্য হিসাবে পরিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়।

বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসার নয়দিন পর, অগাস্ট মাসের ১৮ তারিখে অতি সম্মানিত এই পুরস্কার গ্রহণ করেন তসলিমা নাসরিন। পুরস্কার অনুষ্ঠানে তসলিমা যে ভাষণ দেন, সেটা ছিলো লিখিত ভাষণ। তাঁর বিদেশি বন্ধুদের, বিদেশি ত্রাতাদের মন ভরাতে পারেননি তিনি সেই ভাষণ দিয়ে। জড়তাময় ভাষায় টেনে টেনে তসলিমা যে ভাষণ দেন, তার কিছুটা অংশ এরকমঃ

“I have a dream, a dream of a world without inequality and opression, where women could be strong in their own right, and enjoy digniity and independence.”

হানিফা ডীনের মনোভাব হচ্ছে ভাষণের যে বক্তব্য, সেটাকে তসলিমার ভাষ্য বলে মনে হয় না। মনে হয় অন্য কেউ লিখে দিয়েছে তাঁর ভাষণ। আর সেটাকেই জোর করে পড়েছেন তিনি।

ওই অনুষ্ঠানে আরো অনেকের মতো ক্যারোলাও ছিলেন। তিনিও তসলিমার বক্তব্যে আশাহত হন। তসলিমার ব্যাপারে যে ধরনের ধারণা তাঁরা পোষণ করে আসছিলেন, সেখান থেকে আরো গভীর জীবনদর্শন, বাংলাদেশে তাঁর অবস্থান এবং বাংলাদেশের নারীদের অবস্থান এগুলো নিয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রত্যাশিত ছিলো তাঁদের কাছে। সহজভাবে বললে, সালমান রুশদির ফিমেইল ভার্সনকে তসলিমার মধ্যে আশা করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু, রুশদির জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা এবং বোধশক্তি তসলিমা নাসরিনের ছিলো না। বাংলাদেশ থেকে ভুল পার্সেল এসেছে, এটা বুঝতে কারোরই কোনো অসুবিধা হয়নি। অসুবিধা হচ্ছে একটাই, এই পার্সেলকে ফেরত পাঠানোর সময়ও পার হয়ে গিয়েছে।

তাঁর উদ্ধারকর্তাদের প্রত্যাশা তিনি পূরণ করতে পারেননি, এটা তসলিমাও জানতেন। হানিফা ডীনকে তিনি বলেছেন, “তাঁদের প্রত্যাশা ছিলো আমি সব বিষয়েই বিশেষজ্ঞ হবো। তাঁরা এমন একজনকে খুঁজছিলো যাঁর সাহিত্যমান এবং ইসলামিক স্টাডিজের জ্ঞান অত্যন্ত উঁচু মানের হবে। আমি খুবই বিব্রত এবং লজ্জিত হতাম, যখন তাঁরা আমার কাছ থেকে পৃথিবীর নানা সমস্যার সমাধান জানতে চাইতো। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট কীভাবে সমাধান করা যায়, আধুনিক বিশ্বে নারী এবং ইসলামকে কীভাবে খাপ খাওয়ানো যায়, ইত্যাকার সব বিষয়ে তাঁরা আমার বিশেষজ্ঞ মতামত চাইতো। আমার ধারণা আমি তাঁদের হতাশ করেছি। কারণ, এই সব প্রশ্নের আমি যা উত্তর দিয়েছি সেগুলো খুব একটা ভালো উত্তর ছিলো না।”

চলবে > হানিফা ডীনের 'দ্য ক্রিসেন্ট এন্ড দ্য পেনঃ দ্য স্ট্রেঞ্জ জার্নি অব তসলিমা নাসরিন' - ৩
 

 



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার রোহিঙ্গা দেরকে অত্যাচার করে ফলে ২০১৭ তে অগাস্ট ২৫ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ মাসে ৫ লক্ষ্য রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশ শরণার্থী দেরকে আবার ফিরে পাঠিয়ে দিক?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ