২১ অক্টোবর ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৬ষ্ঠ বর্ষ ৩৯শ সংখ্যা: বার্লিন, রবিবার ২৪সেপ্টে – ৩০সেপ্টে ২০১৭ # Weekly Ajker Bangla – 6th year 39th issue: Berlin,Sunday 24Sep - 30Sep 2017

ধর্ষকের লিঙ্গকর্তন কি অমানবিক?

ধর্ষকের কী শাস্তি হওয়া উচিৎ?

প্রতিবেদকঃ জেসমিন চৌধুরী তারিখঃ 2017-09-26   সময়ঃ 02:55:56 পাঠক সংখ্যাঃ 95

ধর্ষণ বন্ধ করা যায় কীভাবে, এই আলোচনার চেয়ে ধর্ষকের শাস্তি কী হওয়া উচিৎ এই আলোচনায় দেখা যাচ্ছে আমাদের উৎসাহ অনেক বেশি। তো, ধর্ষকের কী শাস্তি হওয়া উচিৎ? যারা নিজেরাই ধর্ষকামী, তাদের মত হলো ধর্ষকদের মা বোনদেরকে ধরে ধরে ধর্ষণ করা হোক, তবেই তারা বুঝবে। এদের কথা আমলে বা আলোচনায় না আনাই ভালো। আবার অনেকে বলছেন জনসমক্ষে ধর্ষকদের পুরুষাঙ্গ কেটে নিলে অথবা এদেরকে নির্যাতন করে তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে হত্যা করলে এবং তা সরাসরি সম্প্রচার করলে ভয় পেয়ে আর কেউ এই কাজ করবে না।

ব্যক্তিগতভাবে আমি আইনের আওতায় এনে বা সুপরিকল্পিতভাবে নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে যে কোন ধরণের হিংস্রতামূলক শাস্তি বিধানের বিপক্ষে। এসব বিষয়ে আমার চিন্তাভাবনাকে কিছুটা পরস্পরবিরোধী বলে মনে হতে পারে। আমি মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করি না, কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের দাবীতে আন্দলনে অংশ নিয়েছি, কারণ এই মাত্রার অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সর্বোচ্চ শাস্তিই প্রযোজ্য বলে মনে করি। সেই দেশের আইনে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা থাকা উচিৎ কী না, সেটাকে একটা ভিন্ন আন্দোলনের বিষয় বলে মনে করি।

আবার যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার পর উল্লাসে মেতে জিলাপি বিতরণেও যোগ দিতে পারিনি বলে অনেকের দ্বারা সমালোচিত হয়েছি। সম্প্রতি একজন নারী তার সম্ভাব্য ধর্ষকের পুরুষদণ্ডটি কেটে নেবার পর এ নিয়ে নানারকম আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে।

কেউ বলছেন বেশ করেছে, পুরুষদণ্ডটি নিজের হেফাজতে রাখলে তো এমনটা ঘটতো না। আবার কেউ বলছেন কাজটা অমানবিক, বেচারা প্রস্রাব করবে কী করে? ধর্ষণের আইনানুগ শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক, এমন শাস্তি মৃত্যু চেয়েও কষ্টকর। কেউ বলছেন, ধর্ষণ করার আগেই যদি পুরুষদণ্ডটি কেটে নেয়া হয় তাহলে কীভাবে প্রমাণ করা যাবে যে সে ধর্ষণ করতেই এসেছিল?

আমার প্রশ্ন হলো যে সমাজে ধর্ষণের জন্য নারীকেই দায়ী করা হয় এবং একথা জানে বলেই বেশিরভাগ মেয়েরা ধর্ষণের কথা গোপন রাখে, যে দেশে ধর্ষণ রিপোর্টেড হলেও সবসময় কেইস হয় না, যে দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষক ধরা পড়ে না আর পড়লেও তার উপযুক্ত শাস্তি হয় না, সে দেশে একটি মেয়ের নিজেকে বাঁচাতে ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে নেয়ার ক্ষেত্রে মানবিকতার প্রশ্ন আসে কীভাবে?

আত্মরক্ষার খাতিরে তো হত্যাও আইনের চোখে সিদ্ধ? একটা মানুষ যদি না মরেই প্রমাণ করতে পারে সে নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্যই একজনকে হত্যা করেছে, একটা মেয়েকে কেন ধর্ষণের ইচ্ছা প্রমাণ করতে হলে আগে ধর্ষিত হতে হবে?

আপনারা আসলে কী বলতে চান? ধর্ষক রাতে দরোজা ঠেলে ঘরে ঢুকে পড়েছে, তাকে তার কাজটা ঠিকঠাক মত সারতে দাও, যথারীতি ধর্ষিত হও। পরে বিচার হলে হবে, কিন্তু তেল আনার ভান করে ব্লেড এনে বেচারার যন্ত্রটি কেটে দিও না। ধর্ষণই করলো না বেচারা, তার আগেই শাস্তি?’ এটাই তো আপনাদের বক্তব্য, তাই না?

আসলে কী জানেন, আপনারা ধর্ষণকে খুব বড় একটা ব্যাপার বলে মনে করেন না। এ আর এমন কী? শুধুই তো যৌনকর্ম যা কমবেশী সবাই করে, ধর্ষণের ক্ষেত্রে বড়জোর একটু জবরদস্তি ঘটে এই যা! গণধর্ষণের পর ঘাড় মটকে অথবা নিজের নাড়িভুড়ি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে খুন হয়ে মরে ভূত হলে তবেই একটা মেয়ের জন্য আপনাদের মনে সহানুভূতি জাগে, তার আগে নয়।

একজন আবার বলেছেন, এখন মেয়েরা সমাজে পিছিয়ে আছে সত্যি, কিন্তু একদিন তারা এগিয়ে যেতে পারে। এধরনের কাজকে সমর্থন দিলে দেখা যাবে ভবিষ্যতে নারীরা নির্দোষ পুরুষের উপরে ধর্ষণের দায় চাপিয়ে তাদের পুরুষাঙ্গ কেটে নিচ্ছে। বাহ, কী চমৎকার যুক্তি!

নির্যাতিত নারীর বর্তমান ফেলে আমাদেরকে নির্যাতক পুরুষের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতে হবে? বর্তমানে এগিয়ে থাকা পুরুষ যেন তার পুরুষদণ্ডটি সহি সালামতে বাঁচিয়ে রেখে ভবিষ্যতেও তার কুকর্ম সমান তালে চালিয়ে যেতে পারে তার জন্য ধর্ষিত হয়ে যেতে হবে বর্তমানের পিছিয়ে থাকা দুর্বল নারীকে?

এমন একটা বিমর্ষ বিষয়ে লিখতে গিয়েও ছোটবেলায় মুখস্ত করা কবিতার লাইন মনে পড়ে যায়- ‘কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে- কভূ আশীবিষে দংশেনি যারে।’ আমরা মেয়েরা ধর্ষিত না হয়েও একটা ধর্ষিত মেয়ের ব্যথা বুঝতে পারি, কারণ বাংলাদেশে বড় হওয়া খুব কম মেয়েই আছে যে বেড়ে ওঠার সময়টাতে যৌন নির্যাতন বা হয়রানীর শিকার হয়নি।

আমি নিজে বহুবার যৌনভাবে নির্যাতিত হয়েছি, এবং একটা মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে শুনলেই প্রথমেই ভাবি ঐ মেয়েটির মত অবস্থা আমারও হতে পারত, কীভাবে যেন হালকা পাতলা নির্যাতনের উপর দিয়ে ফাঁড়া কেটে গেছে।

আমার নিজের শৈশবের যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা আমাকে একজন মা হিসেবে অনেক সতর্ক এবং সচেতন করেছে। আমি আমার বাচ্চাদেরকে ছোট থেকে সবধরনের নির্যাতনের সম্ভাবনা থেকে আগলে রাখতে পেরেছি। তাদেরকে এ সম্পর্কে সচেতন হতে শিখিয়েছি।

এর ফলে একটা নিরাপদ পরিবেশে বড় হওয়া আমার বাইশ বছরের মেয়েটি কল্পনাই করতে পারে না যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা কতটুকু ভয়াবহ হতে পারে। কাজেই ধর্ষকের শাস্তি কী হওয়া উচিৎ এই আলোচনায় তার পক্ষে আমার চেয়ে অনেক বেশি মানবিক থাকা সম্ভব হয়। সে সহজেই বলতে পারে, পুরুষাঙ্গ কেটে নেয়া একটা আইন হতে পারে না। এটা অমানবিক।

সেই একই কথা আপনারাও বললে আমার আপত্তি নেই। এমন একটা আইন হতে পারে না এটা আমারও কথা, কিন্তু পুরুষাঙ্গ কর্তন যেমন একটা মানবিক আইন হতে পারে না, ঠিক তেমনি নিজেকে রক্ষা করতে ধর্ষনেচ্ছুক পুরুষের যৌনাঙ্গ কর্তনও একটা মেয়ের জন্য কিছুতেই অমানবিক হতে পারে না।

এই বিষয়ে আমার এক বন্ধু চমৎকার একটা কথা বলেছেন, ‘আক্রান্ত হলে মেয়ে শুধু লিঙ্গ কেনো, বিচিও কেটে নিক। তোমার লিঙ্গের জন্য মায়া থাকলে নারীর কাছ থেকে ঐটা দূরে রাখ’।

জেসমিন চৌধুরী: অভিবাসী শিক্ষক, লেখক ও অনুবাদক।  >jes_chy@yahoo.com



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

বাংলাদেশের প্রাইমারি ও মাধ্যমিক শিক্ষা পাঠক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছে জানুয়ারি ২০১৭ তে বিতরণকরা নতুন বইয়ে অদ্ভুত সব কারণ দেখিয়ে মুক্ত-চর্চার লেখকদের লেখা ১৭ টি প্রবন্ধ বাংলা বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামী মৌলবাদী লেখা যোগ হয়েছে, আপনি কি এই পুস্তক আপনার ছেলে-মেয়েদের জন্য অনুমোদন করেন?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ