১১ ডিসেম্বর ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৬ষ্ঠ বর্ষ ৩৯শ সংখ্যা: বার্লিন, রবিবার ২৪সেপ্টে – ৩০সেপ্টে ২০১৭ # Weekly Ajker Bangla – 6th year 39th issue: Berlin,Sunday 24Sep - 30Sep 2017

হানিফা ডীনের 'দ্য ক্রিসেন্ট এন্ড দ্য পেনঃ দ্য স্ট্রেঞ্জ জার্নি অব তসলিমা নাসরিন' - ৪

পুস্তক আলোচনা অনুবাদ সাহিত্য

প্রতিবেদকঃ ফরিদ আহমেদ তারিখঃ 2017-09-26   সময়ঃ 02:56:18 পাঠক সংখ্যাঃ 111

তসলিমার ক্ষেত্রে হানিফা ডীন শুরুতে একটা বড় ধরনের ধাঁধাঁর মধ্যে ছিলেন। সে ধাঁধাঁটা হচ্ছে এরকম। তিনি খেয়াল করে দেখলেন, মুসলিম মৌলবাদের বিরুদ্ধে তসলিমার লড়াইয়ের জন্য যে সব নারীবাদীরা সোচ্চার হচ্ছে, তারা সবাই মূলত পাশ্চাত্যের। তসলিমা বাংলাদেশের অগ্রগণ্য নারীবাদী, এই প্রচারণা পাশ্চাত্যের প্রচার মাধ্যম বেশ জোরেশোরে করে আসছে। তিনি যদি সত্যিই সেরকম কিছু হন, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশি নারীবাদীদের কণ্ঠটা কেন শোনা যাচ্ছে না তাঁর পক্ষে? কেন তারা নীরব এবং নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে? কেন তাদের কোনো বিচলন নেই তসলিমার স্বপক্ষে?

এমন না যে বাংলাদেশে কোনো নারীবাদী আন্দোলন হয়নি, বাংলাদেশে কোনো নারীবাদী নেই। তসলিমাই প্রথম এবং তসলিমা থেকেই যাত্রা শুরু হয়েছে বাংলাদেশের নারীবাদী আন্দোলন। এর বিপরীতে গিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের নারীর অধিকার আন্দোলন আদায়ের সংগ্রাম বেশ পুরনো এবং চলমান। তাহলে, অন্য নারীবাদীরা কেন তসলিমার জন্য উচ্চকণ্ঠ হচ্ছে না, কেন তারা নিশ্চুপ রয়েছে দেশের সেরা নারীবাদীটির এই বিপদের সময়? এটা কি ঈর্ষাজনিত কোনো ব্যাপার-স্যাপার? নাকি তাদের কণ্ঠকে রুদ্ধ করে রাখা হয়েছে? আসলেই তারা কি তার পক্ষে রয়েছে?

তসলিমা নাসরিন এবং বাংলাদেশের নারীবাদী আন্দোলন, এই দুটো কখনোই একবিন্দুতে মিলিত হয়নি। তসলিমা যেমন অন্য সব নারীবাদীদের সঠিকভাবে বুঝতে পারেননি, ঠিক একইভাবে বাকিরাও তাঁকে কখনোই বুঝতে পারেনি। পরস্পরের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে তাঁরা। এই দূরত্ব বন্ধুত্বেরও না, আবার শত্রুতারও না। এটা একটা অদ্ভুত ধরনের সম্পর্ক।

“১৯৯৩ সালের পর থেকে তাঁকে সমর্থন করাটা যেমন অসম্ভব ছিলো, আবার তাঁকে অসমর্থন করাটাও অসম্ভবই ছিলো।” নারীপক্ষের একজন কর্মী হানিফার কাছে তাঁর অবস্থান ব্যাখ্যা করেন এভাবে।

বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিরাই শুরুর দিকে তাঁর সাহসের প্রশংসা করেছেন, তাঁর লেখা পছন্দ করেছেন। সমাজের উচ্চ পর্যায়ে থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ লোকজনের সাথে তাঁরা তাঁকে পরিচয়ও করিয়ে দিয়েছেন। যদিও রূঢ়, রুক্ষ এবং কর্কশ আচরণের জন্য তসলিমার বেশ ভালো ধরনেরই বদনাম ছিলো। সামাজিক অনুষ্ঠানসমূহে তিনি অন্য নারী অতিথিদের সাথে খুবই বাজে আচরণ করতেন। তাঁর তরুণ ফ্যানদের প্রতিও তাঁর আচরণ ছিলো কর্কশ ধরনের। তিনি তাদের ধমকাধমকির উপরেই রাখতেন। সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁর মূল কাজ ছিলো সবাই ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে পুরুষদের দিকে বিশেষ করে প্রভাবশালী পুরুষদের দিকে এগিয়ে যেতেন।

নারী আন্দোলনের নেত্রীরা তসলিমার ইসলাম ধর্ম এবং পুরুষদের নিয়ে হাসি, ঠাট্টা-তামাশা আর মস্করা করা নিয়ে বেশ অস্বস্তিতে ভুগতেন। তসলিমা যেগুলো লিখছেন, সেগুলোকে একান্তে তাঁরা পছন্দ করলেও, এর ফলাফল নিয়ে ভীত ছিলেন। এগুলো মোল্লাদের এবং রক্ষণশীল পুরুষদের ক্ষিপ্ত করে তুলবে, এটাই ছিলো তাঁদের ভীতির মূল কারণ।

বাংলাদেশের নারী আন্দোলন বা নারীর জাগরণের পিছনে যাঁরা কাজ করছিলেন, তাঁরা এগোচ্ছিলেন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে। এদের কর্মকাণ্ডের একটা বেশির অংশ জুড়েই ছিলো বিদেশি সাহায্যপুষ্ট এনজিও-র মাধ্যমে। এরা গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাইক্রোক্রেডিট চালু করেছিলো, চালু করেছিলো এমপ্লয়মেন্ট প্রজেক্টস। একই সাথে এক ধরনের ধর্ম-নিরপেক্ষ শিক্ষারও সূচনা তাঁরা করেছিলো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য। মাদ্রাসার বিপক্ষে এনজিও-র গড়া স্কুল, ঝাড়-ফুক, তন্ত্রমন্ত্রের বিরুদ্ধে হেলথ ক্লিনিক নিয়ে এগিয়ে আসে এনজিওরা। এইসব এনজিওতে যাঁরা কাজ করতো, বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে, এদের অধিকাংশই ছিলো নারী। এনজিওগুলোর এইসব কর্মকাণ্ডকে সুদখোর মহাজন, জোতদার শ্রেণী, ধনী কৃষক এবং মৌলবাদী মোল্লারা ভালো চোখে দেখেনি কখনো। এর যতোটা না ধর্মীয় কারণে ছিলো, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিলো অর্থনৈতিক কারণে। এনজিগুলোর কারণে এদের আয়-রোজগার কমে গিয়েছিলো।

এই বিপক্ষে যাওয়া লোকগুলোকে চরমভাবে না খেপিয়ে, নিজেদের কাজকে নীরবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নারীকর্মীরা তখন বেশি সক্রিয় ছিলো। মাইনফিল্ডের উপরে বসে কাজ করতে গেলে যে সতর্কতা লাগে, এদের সতর্কতা পুরোপুরিভাবেই সেরকম ছিলো। এটাকে আপোস হিসাবে না দেখে, তারা দেখেছে কৌশল হিসাবে। প্রত্যন্ত গ্রামে এবং মফস্বল শহরে বাঘের আস্তানায় বসে হরিণের জন্য কল্যাণকর্ম করতে গেলে, এই সাবধানতার প্রয়োজন ছিলো বলে তারা মনে করেছে। সামান্য একটু অসতর্ক আচরণ, সামান্য একটু অতি-বিশ্বাস দেখালেই মৌলবাদীরা তাদের বিরুদ্ধে মিছিলে নামবে, তাদের পরিচালিত ক্লিনিক এবং স্কুলগুলোকে পুড়িবে দেবে, তাদের এলাকা ছাড়া করবে, এটা জেনেই এই বিপদজনক পথে ধীরস্থিরভাবে অগ্রসর হবার সিদ্ধান্ত ছিলো তাদের। তসলিমা নাসরিন বাংলাদেশের নারীদের এই আন্দোলনের সাথে কখনোই সম্পৃক্ত ছিলেন না। বৈরীভূমিতে নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে এরা যে কৌশল অবলম্বন করে চলেছিলো, সেটাকেও তসলিমার বোঝার চেষ্টা করেন নাই। ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া হিসাবে কী আসতে পারে, সেটা সম্পর্কে স্বচ্ছ কোনো ধারণাই তাঁর আসলে ছিলো না। নিজের উচ্চকণ্ঠ নিয়েই আত্মহারা ছিলেন তিনি।

“সবকিছুই তাঁকে কেন্দ্র করে ঘটছে, সবকিছুই তাঁর সাথে হচ্ছে, অন্যরা সেখানে একেবারেই অনুপস্থিত।” একজন শিক্ষাবিদ নারী হানিফাকে বলেন। “তাঁর লেখা পড়ে দেখো। সেখানে তিনি ছাড়া আর কারো কোনো অস্তিত্বই নেই। একজনের নিজস্ব ইগো নিয়ে লেখালেখিটা খুব বেশিদিন আগ্রহ নিয়ে পড়া যায় না। এর আবেদন ফুরাতে বাধ্য।”

“তোমাকে কাজ করতে হবে এমনভাবে যাতে সমাজ ধ্বংস না হয়ে তাতে পরিবর্তন আসে।” আরেকজন এনজিও কর্মী হানিফাকে তাঁর মত দিয়েছেন এভাবে।

“তাঁকে আসলে আমাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা হয়েছে।” অন্য আরেকজন নারীবাদী মত দিয়েছেন এভাবে। “দাঁড়ি-টুপিওয়ালা মোল্লা থেকে শুরু করে প্রগতিশীল পুরুষ, সবাই তাঁকে ব্যবহার করেছে আমাদের বিরুদ্ধে। এমনকি যারা নামাজ -রোজা করে না, এমন নামমাত্র মুসলমান, তারাও এই সুযোগ নিয়ে হামলা চালিয়েছে আমাদের উপরে। নারী অধিকার নিয়ে কিছু বলতে গেলে কিংবা কিছু করতে গেলেই তারা কথা শুনিয়েছে এই বলে যে, “তুমি কি আরেক তসলিমা নাসরিন হতে চাও?”

দীর্ঘদিন ধরে নারীর অধিকার আন্দোলন করে আসা পোড় খাওয়া নারীবাদীদের কাছে তসলিমা ছিলেন মূলত বোঝাস্বরূপ।

হানিফা ডীনের 'দ্য ক্রিসেন্ট এন্ড দ্য পেনঃ দ্য স্ট্রেঞ্জ জার্নি অব তসলিমা নাসরিন' - ৩



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার রোহিঙ্গা দেরকে অত্যাচার করে ফলে ২০১৭ তে অগাস্ট ২৫ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ মাসে ৫ লক্ষ্য রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশ শরণার্থী দেরকে আবার ফিরে পাঠিয়ে দিক?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ