২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৭ম বর্ষ ২৬ সংখ্যা: বার্লিন, সোমবার ২৫জুন–০১ জুল ২০১৮ # Weekly Ajker Bangla – 7th year 26 issue: Berlin, Monday 25Jun -01 Jul 2018

ভাস্কর্যশিল্পী নভেরা আহমেদ

বাংলাদেশের ভাস্কর্য শিল্পের অন্যতম অগ্রদূত নভেরা

প্রতিবেদকঃ মোনাজ হক তারিখঃ 2018-06-29   সময়ঃ 14:35:17 পাঠক সংখ্যাঃ 136

অনেকেরই হয়তো মনে আছে বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্যের পথিকৃৎ ভাস্কর্যশিল্পী নভেরা আহমেদ এর কথা। তিনি ২০১৫ সালে ৬ মে প্যারিসে ৭৬ বছর বয়েসে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর এরই মাঝে তিনটি বছর কেটে গেছে। জীবনের বড় একটা অংশই, সেই ১৯৭০ থেকেই নভেরা কাটিয়েছেন শিল্পকলার দেশ ফ্রান্সের রাজধানি প্যারিসে, একান্ত নিজস্ব পরিবেশে, কাটিয়েছেন ফরাসি স্বামী গ্রেগোয়া দ্য ব্রন্সক এর সাথে। লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকেই শিল্পের সাথে কাটিয়েছেন সেখানে তিনি দীর্ঘ ৪৫ বছর। 

নভেরা দেশে-বিদেশে রেখে গেছেন তাঁর শিল্পকর্মের অসংখ্য গুণগ্রাহী। কিন্তু বাংলাদেশে তিনি আর কখনো ফেরেন নি, হয়তো অভিমান, হয়তোবা প্রাপ্ত সন্মান থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিমান! ষাট দশকে বাংলাদেশ ছিলো চারুকলা আর ভাস্কর্যসমৃদ্ধ উদার মানসিকতার আর সেকুলার চিন্তার একটি দেশ। একুশের শহীদ মিনার তৈরি শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক নয়, প্রতিটি জেলা শহরে ভাষা আন্দোলনের প্রতিক শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরিকরণ বাংলা সংস্কৃতির সাথে অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত। পাকিস্তানী শাসকরা ও সেসময় সাহস পায় নি শিল্পকলা আর ভাস্কর্যকে নষ্ট করতে, যা এখনকার বাংলাদেশে অহরহ হচ্ছে (লালন ভাস্কর্য বা বিচারালয় থেকে জাস্টিসিয়া ভাস্কর্য) নামিয়ে ফেলা।

মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়, পাকিস্তানি শাসকরা শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার উপর খড়গ চালিয়েছে মাঝেমধ্যেই। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন অনেক কষ্টে চারুকলা ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাও আছে মাত্র দুটি বিভাগ, একটি হলো ড্রয়িং ও পেইনটিং এবং আরেকটি কমার্শিয়াল আর্ট বিভাগ। কিন্তু এই দুটি বিভাগ নিয়েও অনিশ্চয়তার শেষ ছিলো না। কারণ ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করা পাকিস্তানি শাসকেরা চারুকলা ইন্সটিটিউট বন্ধ করে দিতে একবাক্যে রাজি। চারুকলার প্রতিষ্ঠাতাদের অনেকেই মৃত্যুর হুমকি পর্যন্ত পেয়েছিলেন, অনেকে আবার ধর্মান্ধদের হাতে লাঞ্ছিতও হয়েছেন। এমন পরিবেশে ভাস্কর্য বিভাগ খোলা কিংবা প্রদর্শনী করার চিন্তাও মাথায় ছিলো না কারো।

এর মধ্যে ১৯৬০ সালের ৭ আগস্ট সবাইকে চমকে দিয়ে ঢাকার কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার) শুরু হলো ভাস্কর্য প্রদর্শনী। পাকিস্তান জাতিসংঘ সমিতির উদ্যোগে এবং এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আয়োজিত “ইনার পেজ” শিরোনামের সেই প্রদর্শনীতে আছে নভেরা আহমেদ নামে ইউরোপ ফেরত এক নারী শিল্পীর নিজের করা কিছু ভাস্কর্য। পঁচাত্তরটি ভাস্কর্য নিয়ে করা ঐ দশ দিন ব্যাপী প্রদর্শনীটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা ছিলো।পাকিস্তানের সে সময়কার দমবন্ধ অবস্থায় একজন নারী ভাস্কর্যশিল্পী হিসেবে পাকিস্তানের প্রথম ভাস্কর্য প্রদর্শনী করতে যে কি পরিমাণ সাহসের দরকার হয় সেটা চাট্টিখানি কথা ছিলো না। তবুও সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশের আধুনিক ভাস্কর্য শিল্পের পথিকৃৎ সেই শিল্পী নভেরা আহমেদকে আমরা কখনোই কাজের উপযুক্ত সম্মান দিতে পারি নি, তার কাজের যথাযথ মুল্যায়নও করতে পারি নি।

১৯৩০ সালে নভেরার জন্ম চট্টগ্রামে, শিল্পী হাশেম খানের এক লেখায় প্রকাশ, নভেরার বাবা ছিলেন এক্সাইজ অফিসার।  ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) কুমিল্লায় বদলি হন তিনি।

তার আগে কলকাতায় নভেরার শৈশব কাটার ইঙ্গিত পাওয়া যায় ওই লেখায়। চারুকলার অধ্যাপক হাশেম খানের দেওয়া তথ্যমতে, ভাস্কর্য বিষয়ে পড়াশোনা করতে ১৯৫১ সালে লন্ডন যান নভেরা। লন্ডনের ক্যাম্বারওয়েল আর্ট স্কুলে লেখাপড়া করেন তিনি। সেখানেই শিল্পী হামিদুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয় তার। প্রায় ছয় বছরে কেম্বারওয়েলের ডিপ্লোমা অর্জন ছাড়াও তিনি প্যারিস, ভিয়েনা ও ফ্লোরেন্সে যেয়ে ইউরোপীয় সমকালীন ভাস্কর্য প্রবণতাসমূহের সঙ্গে পরিচয় ও ভাস্করবৃন্দের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য অর্জন করে ১৯৫৬ সালে ঢাকায় ফিরে আসেন।

নভেরা এমন সময় দেশে ফিরলেন যখন এদেশের প্রথম প্রজন্মের শিল্পীরা অর্থাৎ জয়নুল, কামরুল, সফীউদ্দিন প্রমুখ প্রকৃতি, লোকজীবন ও লোকশিল্পকে উৎস হিসেবে গ্রহণ করে চিত্রকলায় ‘আধুনিক ধারা’ প্রবর্তনের দুরূহ সংগ্রামে রত। অপরদিকে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপে উচ্চতর শিল্পশিক্ষা শেষে এ-সময় দেশে ফিরেছেন বা ফিরছেন। এঁরা সকলেই তাঁদের শিক্ষার্থী জীবনে প্রবহমান মুক্ত ও প্রগতিবাদী চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হন। আবার পাশ্চাত্যের চলমান শিল্পপ্রবণতার গতিময়তাও তাঁদের আকৃষ্ট করে। পশ্চিমের চিত্রকলার বির্মূত আঙ্গিক, বিশেষত বির্মূত প্রকাশবাদ তাঁদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে ও পরবর্তীকালে তাঁদের শিল্পচর্চায়ও বিশেষভাবে প্রভাব ফেলে। নভেরা বাংলাদেশের আধুনিক ধারার শিল্পের এই পরবর্তী বা দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পী হয়েও নানাভাবেই ছিলেন স্বতন্ত্র ও ব্যতিক্রম।

ইউরোপের বাস্তবানুগ অ্যাকাডেমিক ধারায় অনুশীলন করলেও ১৯৫৫ সালে দেশে ফিরে নভেরা নতুন শিল্পভাষা নির্মাণে ব্রতী হন। সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় একজন নারীর শিল্পী হিসেবে, বিশেষত ভাস্কর হিসেবে আত্মপ্রকাশ নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জিং ছিলো। 

১৯৫৭ সালে হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কাজ শুরু করেন। হাশেম খান লেখেন, “শহীদ মিনারের জন্য অনেক মডেল জমা পড়লেও হামিদ-নভেরার ডিজাইনটিই নির্বাচিত হয়। প্রায় একমাস খেটে দু’জনে ডিজাইনটি তৈরি করেছিলেন। ’৫৭-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। কাজ চলে ’৫৮ সাল পর্যন্ত। কিন্তু শেষ হওয়ার আগেই মার্শাল'ল জারি হওয়ায় শহীদ মিনারের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।”

বাংলাদেশের ভাস্কর্য শিল্পের অন্যতম অগ্রদূত নভেরাকে যদিও বা ১৯৯৭ সালে একুশে পদকে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার, কিন্তু কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের স্থপতি হিসেবে শুধু শিল্পী হামিদুর রহমান এর নাম নথিপত্রে লেখা হয়। তাই অনেকেই বলেন নভেরা মনঃক্ষুণ্ণ হয়েই দেশান্তরী হয়ে শিল্পকলার নগরী প্যারিস চলে আসেন। দীর্ঘ চার দশক পর ২০১৪ সালে জানুয়ারিতে প্যারিসে নভেরা আহমেদের শিল্পকর্মের আবারো প্রদর্শনী হয়। তার আগে ১৯৭৩ সালে জুলাই মাসে প্যারিসে তার সর্বশেষ প্রদর্শনী হয়েছিলো।

তথ্যসুত্র: ১) আবু তাহের, আনোয়ার জাহান, বাংলাদেশের সমকালীন চারুকলা সিরিজ-৪৯, ঢাকা, ১৯৯৪
২) এনামুল হক, দ্বিতীয় জাতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনী, বাংলাদেশের সমকালীন চারুকলা সিরিজ-২৫, ঢাকা, ১৯৮৩
৩) নাসিমুল খবির, বাংলাদেশের সমকালীন ভাস্কর্য (১৯৫৫-২০০৫), গড়ন ও উপকরণ, ঐক্য ও বৈচিত্র্য, ঢাকা, ২০০৬
৪) মিজারুল কায়েস, শামীম সিকদার, বাংলাদেশের সমকালীন চারুকলা সিরিজ-২১, ঢাকা, ১৯৮২

 



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার রোহিঙ্গা দেরকে অত্যাচার করে ফলে ২০১৭ তে অগাস্ট ২৫ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ মাসে ৫ লক্ষ্য রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশ শরণার্থী দেরকে আবার ফিরে পাঠিয়ে দিক?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ