২২ আগস্ট ২০১৮ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৭ম বর্ষ ৩১ সংখ্যা: বার্লিন, সোমবার ৩০জুল–০৫অগা ২০১৮ # Weekly Ajker Bangla – 7th year 31 issue: Berlin, Monday 30Jul-05Aug2018

পড়ুয়াদের দাবি, ‘নিরাপদ সড়ক চাই’

টনক তুমি নড়বে কবে !

প্রতিবেদকঃ জাহান আরা দোলন তারিখঃ 2018-08-04   সময়ঃ 15:34:37 পাঠক সংখ্যাঃ 81

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় গত রবিবার দুপুরের দিকে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়েছে দুই পড়ুয়া। এই মৃত্যুর প্রতিবাদে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাস্তায় নেমেছে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা। কারণ, ঢাকার রাস্তায় পথ-দুর্ঘটনায় মৃত্যু-মিছিল ক্রমবর্ধমান। পড়ুয়াদের দাবি, ‘নিরাপদ সড়ক চাই’।

আসলে, দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকার সড়ক নিরাপদ নেই। সড়ক যে নিরাপদ ছিল না, সেই বিষয়টি অনেকদিন চাপা পড়ে ছিল। এবার রাস্তায় নেমে পড়ুয়ারা বিষয়টি সবার সামনে নিয়ে এসেছে। এই বিক্ষোভকে সমর্থন জানিয়েছেন সর্বস্তরের অভিভাবক, বিভিন্ন পেশার মানুষ। তাঁদের ছেলেমেয়েদের এই আন্দোলনকে বিশেষ করে সমর্থন জানিয়েছে পড়ুয়াদের মায়েরা। এই আন্দোলনে কি প্রশাসনের উপর এক ধরনের অনাস্থাই প্রকাশ পেয়েছে? পড়ুয়ারা সম্ভবত প্রশাসনের ওপর ভরসা করতে পারছে না। তাই বাধ্য হয়েই রাস্তায় নেমেছে। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের এই আন্দোলন মানুষ সমর্থন করেছে। সাধারণ মানুষ এই আন্দোলন নিয়ে একটিও কটু কথা বলেনি। স্কুলের শিক্ষার্থীদের এ ধরণের বিস্তৃত বিক্ষোভ সচরাচর দেখা যায় না।

“নিরাপদ সড়ক চাই”, এই আন্দোলনকে সমর্থন করে কলম ধরেছেন বাংলাদেশের এই প্রজন্মের কবি ও সাহিত্যিক জাহান আরা দোলন। সঙ্গের ছবি ও ভিডিও ক্লিপিংও দিয়েছেন তিনিই।

----------------------------------

যমুনা ফিউচার পার্কে যেতে হয়েছিল সেদিন। পাসপোর্টের ডেলিভারি ডেট। কাজ শেষ হতে হতে বেলা তিনটে পার। ভাবির বাসা মহাখালি। সিএনজি করে মহাখালি যাওয়ার পথে, রাস্তার দিকে তাকিয়ে কী রকম একটা অজানা শীতল অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হলাম। সমস্ত রাস্তা ভর্তি ভাঙা কাঁচ। গাড়ির উইন্ডশিল্ডের কাঁচ। কাঁচ বিছানো রাস্তা ঠিক কতখানি পেরিয়ে এলাম, বলতে পারব না। এপাশের ওপাশের পিচঢালা পথে শুধু ভাঙা কাঁচ আর কাঁচ। স্বচ্ছ, নীলচে, সবুজাভ বিভিন্ন রঙের।

আরও খানিকটা পথ পেরিয়ে দেখি কাঁচ বিছানো রাস্তার একপাশে তিনটি জাবালে নুরের বাস। গাড়িগুলোর একটাতেও কোন গ্লাস নেই, কালচে রঙের চিহ্ন সমস্ত শরীরে। বোঝা যায়, আগুন ধরেছিল। নিভে গেছে অথবা নিভিয়ে ফেলা হয়েছে। বনানীর দিকের ফ্লাইওভারে ওঠার আগেই সিএনজি বন্ধ হয়ে গেল। সামনের টায়ারে গ্লাস ঢুকে টায়ার বেঁকে গেছে। টায়ার বদল করে মহাখালি পৌঁছতে বিকেল। আমাকে আরও অনেকটা পথ যেতে হবে। মণিপুরি পাড়া, ফার্মগেট। রিকশায় পৌঁছতে সন্ধ্যা।

সারাটাদিন নিউজফিড চেক করা হয়নি ব্যস্ততায়। রুমে ফিরে অনলাইনে আসতেই নিউজফিড ভর্তি যে খবরটা দেখলাম, সেটা যেন আগের থেকেই জানতাম। দাঁড়িয়ে থাকা দুই স্কুল ছাত্রছাত্রীর গায়ের ওপর উঠিয়ে দিয়েছে জাবালে নূরের একটা বাস। কচি কচি দুটো বাচ্চা ছেলেমেয়ের জীবন শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল। ঢাকার সব স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা ক্ষুব্ধ। তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে রাস্তায়। খুব স্বাভাবিক এই প্রতিক্রিয়া। বরং এমনটা না হলেই অবাক হতাম। দলের, প্রশাসনের তাঁবেদারি করা ছাড়া মানুষ তো দেশে এখন খুঁজে পাওয়া দায়। এমন সময়ে একমাত্র ওরাই আছে যারা এতটা হীনম্মন্যতায় আক্রান্ত হয়নি। নিজের আত্মাকে বিক্রি করে দেয়নি।

 

আগে বসুন্ধরা আবাসিকে থাকতাম। রেসিডেন্সিয়ালের গেট পার হয়ে নতুন রাস্তা পর্যন্ত রিকশা ভাড়া ত্রিশ/চল্লিশ টাকা, কখনও কখনও সেটা পঞ্চাশে গিয়েও ঠেকে। মিরপুর থেকে আসা জাবালে নূর, আকীক, নূর ই মক্কা নামের বাসে পাঁচ টাকা। রাইদা, তুরাগেও একই ভাড়া। কিন্তু সুপ্রভাত, অনাবিল সালসাবিল নামের বাসে উঠলেই দশটাকা। সিট থাকুক বা না থাকুক।এই বাসগুলোর প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের একটা অলিখিত প্রতিযোগিতা চলে। এক বাস অন্য বাসকে আগে যেতে না দেওয়ার জন্য রাস্তার মাঝখানে গাড়ি আড়াআড়ি করে পথ আটকে যাত্রী ওঠায় এবং নামায়। গাড়ি রাস্তার পাশে নিয়ে যাত্রী নামানোর কাজটা এরা এভাবেই মধ্যরাস্তায় সম্পন্ন করে।

অন্য কোম্পানির বাস সামনের বাসকে ওভারটেক করলেই শুরু হয় মূল প্রতিযোগিতা। বাসের রেস। পিছিয়ে থাকা বাস ভয়াবহ গতিতে এগিয়ে সামনের বাসকে ধাক্কা দিতে থাকে। পাশাপাশি অবস্থানে এসে গেলে এক বাস অন্য বাসকে হুকের মত আটকে নিয়ে সমস্ত রাস্তা জুড়ে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে টেনে নিতে থাকে দীর্ঘ পথ। সঙ্গে থাকে অনবরত খিস্তিখেউড়। গিনিপিগ যাত্রীরা জীবন হাতে নিয়ে গাড়িতে বসে থাকে। তাদের কথা বলার মতো জায়গা নেই, শোনার মত মানুষ নেই। নামতে গেলে দেখা যায়, একবিন্দু জায়গাও ফাঁকা নেই নামবার মতো। কখনও কখনও যাত্রীরা এভাবে মধ্যরাস্তায় নামতে গিয়ে চাপা পড়ে অন্য গাড়ির নিচে।

অধিকাংশ বাসের ড্রাইভার হেল্পারের বয়সই আঠারোর কম। এরা গাড়ি নিয়ে রেস খেলে। যাত্রীদের জীবন নিয়ে খেলে। এদের অপরিণত খামখেয়ালিপনার শিকার যাত্রীরা। অসহায়ভাবে তারা প্রতিদিন নিজের জীবন হাতে নিয়ে পথে বের হয়। জীবন হারায়।

প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি দুজন ছাত্রছাত্রীর অকালমৃত্যুর খবর নিয়ে মস্করার হাসি হাসেন। মানুষের মৃত্যুর খবরে হাসি পায়, এমন দু’পেয়ে জীব এখন প্রশাসনের অভ্যন্তরে প্রায় সর্বত্র। কেউ অন্য দেশের কাল্পনিক উদাহরণ টানেন, কেউ প্রসঙ্গের মোড় ঘোরাতে গাড়ির গুণগত মানহীনতা নিয়ে বলেন। আরে জনাব, আপনারা থাকতে এই গুণগত মানহীন গাড়িগুলো রাস্তায় বের হয় কী করে? আপনারাও তো ঢাকার রাস্তায় চলাচল করেন। আপনাদের চোখে পড়ে না এগুলো? ওহ্হো! কী করে চোখে পড়বে, গাড়ির কাঁচগুলো তো কালো রঙের। সেই কালো ভেদ করে এসব অনাচারের কালো আপনাদের চোখে পড়বে না।

দরকার নেই আপনাদের চোখে পড়ার। বুড়ো চোখে দেখতে হলে ডাবল পাওয়ারের চশমাতে হবে না। ম্যাগনিফাইং গ্লাস লাগবে। আপনারা বরং অবসরে যান। দেশটা আনিসুল হকের মতো কিছু লোকের হাতে ছেড়ে দেন। তারপর দেখুন। একজন আনিসুল হক একাই অনেক করেছেন রাস্তা এবং পরিবহণ ক্ষেত্রে। সমস্ত ঢাকাতে যদি এই ব্যবস্থা করা যেত!

প্রশাসনের অযোগ্যতার যথাযথ উত্তর দিতে আজ ছাত্রছাত্রীরা “নিরাপদ সড়ক”-এর দাবিতে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে। নিয়ম কী এবং কেমন সেটা চোখের ভেতরে আঙুল ঢুকিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। রাস্তায় শৃঙ্খলা এনে দেখিয়ে দিয়েছে, এই ঢাকাতেও এটা সম্ভব।
পড়ুয়াদের এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাস্তবতা উন্মোচিত হয়েছে। ছেলেমেয়েরা নিঃস্বার্থভাবে পথে নেমেছে। তাদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা আছে। তারা দেখিয়েছে, মানুষের মধ্যে শক্তি আছে, তারা অনেক কিছু করতে পারে। এই শক্তিকে সব সময় চাপা দিয়ে বা দমিয়ে রাখা যায় না। এই কোমলমতি পড়ুয়াদের পুলিশ লাঠিপেটা করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গিয়েছে এই দৃশ্য। পুলিশ ছাত্রীদের গায়েও হাত দিয়েছে। এগুলো ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে সে কারণেই।

হ্যাঁ, অসুবিধা হচ্ছে। প্রতিদিন অফিস যেতে হয়। বাসে করেই যাই খরচ বাঁচাতে। এ’কদিন পারিনি। আগামী একমাসও যদি না পারি তাতে একটুও খারাপ লাগবে না আমার। আমার পূর্ণ সমর্থন এই আন্দোলনে। প্রতিদিন রাস্তায় বেরিয়ে ভাবতে চাই না, বেঁচে ফিরতে পারব তো!

আমরা খুন হতে চাই না। সুস্থভাবে ঘরে ফিরতে চাই। নিরাপদ সড়ক চাই।

 



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার রোহিঙ্গা দেরকে অত্যাচার করে ফলে ২০১৭ তে অগাস্ট ২৫ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ মাসে ৫ লক্ষ্য রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশ শরণার্থী দেরকে আবার ফিরে পাঠিয়ে দিক?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ